প্রবৃদ্ধি কমছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে: চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতি
বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে একদিকে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে।
এক সপ্তাহ আগে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসেও অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন রয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়বে মানুষের আয়, ব্যয়, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ওপর।
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া মানেই জাতীয় উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধির গতি দুর্বল হওয়া। আর মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের হাতে থাকা অর্থ দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা যায়। এই দুই পরিস্থিতি একসঙ্গে দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও আয় সেই অনুপাতে না বাড়ায় সংসারের বাজেট সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় ব্যয়ও কমিয়ে আনতে হয়। ফলে দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ে, কমে সঞ্চয়ের সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে এই সংকটের দায় শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, সরবরাহব্যবস্থার সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিঃসন্দেহে চাপে ফেলেছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সেই চাপকে কতটা বাড়িয়ে তুলছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সরকারের রাজস্ব আয় সীমিত থাকা সত্ত্বেও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি, বড় অবকাঠামো প্রকল্প এবং অন্যান্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। সব সরকারি ব্যয়ই অনুৎপাদনশীল নয়; অবকাঠামো ও জনসেবায় বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু যেসব ব্যয় থেকে উৎপাদন, কর্মসংস্থান কিংবা জনকল্যাণে যথাযথ সুফল আসে না, সেসব খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হলে তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
Comments