অর্থনীতি সংকুচিত, ব্যাংক উদ্ধারে জনগণের টাকায় ভরসা—সংকটের বোঝা কার কাঁধে?
প্রবৃদ্ধির গতি কমছে,শিল্পে নতুন ক্রয়াদেশ নেই,নির্মাণ ও সেবা খাতে সংকোচন,বাড়ছে দারিদ্র্যের উদ্বেগ। অন্যদিকে,দুর্বল ব্যাংক পুনরুদ্ধারে বছরের পর বছর সরকারি অর্থ ব্যয়ের সম্ভাবনা। প্রশ্ন উঠছে ব্যাংক খাতের অনিয়মের দায় কেন শেষ পর্যন্ত বইতে হবে সাধারণ মানুষকে?
দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। শিল্প উৎপাদন ও নতুন ক্রয়াদেশে মন্দা, নির্মাণ খাতের সংকোচন এবং সেবা খাতের টানা দুর্বলতা অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে বিনিয়োগে স্থবিরতা,রপ্তানি ও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ এবং শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। পরবর্তী অর্থবছরে তা ৩ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রবৃদ্ধির এই গতি দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতির এমন দুরবস্থার মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে ব্যাংক খাত। দীর্ঘদিনের অনিয়ম,ঋণখেলাপি সংস্কৃতি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে যেসব ব্যাংক আর্থিক সংকটে পড়েছে,সেগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশ্বব্যাংক দুর্বল ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে নিষ্পত্তির মতো কঠিন পদক্ষেপ বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
এদিকে,ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর পর্যন্ত জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বক্তব্য সামনে এসেছে। এই অর্থের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয়ের কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত স্পষ্ট হওয়া জরুরি। কারণ,জাতীয় বাজেটের অর্থের চূড়ান্ত উৎস জনগণের কর ও রাষ্ট্রের অন্যান্য আয়।
এখানেই দেখা দিচ্ছে বড় প্রশ্ন: যাঁদের অনিয়ম,ঋণখেলাপি বা অর্থ আত্মসাতের কারণে ব্যাংকগুলো সংকটে পড়েছে, তাঁদের কাছ থেকে অর্থ আদায় ও দায় নির্ধারণের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে? আর্থিক অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় না এনে রাষ্ট্রীয় অর্থ দিয়ে ব্যাংক পুনরুদ্ধার করা হলে তার দায় কার্যত সাধারণ করদাতাদের ওপর পড়তে পারে। এতে নৈতিক ঝুঁকিও তৈরি হয়, অর্থাৎ,অনিয়ম করেও পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের কর্মকাণ্ড নিরুৎসাহিত করা কঠিন হবে।
অন্যদিকে,সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও কমার লক্ষণ স্পষ্ট নয়। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন,পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়াতে পারে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির অর্থনৈতিক প্রভাব এবং অন্যান্য ব্যয়চাপও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিতে আরও চাপের আশঙ্কা রয়েছে। তবে এর প্রকৃত মাত্রা নির্ভর করবে বাজার পরিস্থিতি,সরবরাহব্যবস্থা,নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক উপাদানের ওপর।
মূল্যস্ফীতির চাপে সবচেয়ে বেশি ভোগেন সীমিত আয়ের মানুষ। তাঁদের আয় যে হারে বাড়ে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তার চেয়ে দ্রুত বাড়লে খাদ্য,চিকিৎসা,শিক্ষা ও বাসস্থানের ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হতে পারে। ফলে একদিকে আয় বৃদ্ধির সুযোগ কমে,অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে আর দুই দিক থেকেই চাপে পড়েন সাধারণ মানুষ।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ঘোষণা যথেষ্ট নয়। দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা প্রকাশ,স্বাধীন নিরীক্ষা,অনিয়মের তদন্ত,ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক পুনরুদ্ধারে সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন,শর্ত,সময়সীমা ও জবাবদিহির কাঠামো জনগণের সামনে স্পষ্ট করা জরুরি।
অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন,শিল্প উৎপাদন বাড়ানো,কর্মসংস্থান সৃষ্টি,নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো,ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলার নামে যেন অনিয়মকারীরা দায়মুক্তি না পান এবং সাধারণ মানুষকে অন্যায্যভাবে সেই সংকটের মূল্য দিতে না হয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কত হবে,তা নয়; প্রশ্ন হলো, অর্থনীতির সংকটের দায় কে নেবে? ব্যাংকের অর্থ লুটের অভিযোগে যাঁদের নাম উঠে আসে, তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে জনগণের করের টাকায় ব্যাংক উদ্ধারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের ন্যায়সংগত ব্যবহার নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রকৃত পরীক্ষা তাই শুধু ব্যাংক বাঁচানো নয়, বরং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
Comments