মৃত্যুদণ্ড কি ন্যায়বিচার, নাকি সহিংসতার প্রদর্শনী? যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিতর্ক
প্রায় ৯০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ইতিহাস নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ঘোষণায়, ২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে ১৩ সহকর্মী সেনাকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ঘোষণা ঘিরে দেশটিতে শুরু হয়েছে বিতর্ক।
মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য জনসমক্ষে প্রচার করলে অপরাধের পরিণতি সম্পর্কে মানুষ সচেতন হবে, নাকি রাষ্ট্রীয় শাস্তি বিনোদনের উপকরণে পরিণত হবে—এমন প্রশ্ন তুলছেন গবেষক ও সমালোচকেরা।
১৯৩৬ সালে ফাঁসি দেখতে ২০ হাজার মানুষের ভিড়
১৯৩৬ সালের ১৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকি অঙ্গরাজ্যের ওয়েন্সবোরো শহরে রেইনি বেথিয়া নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ৭০ বছর বয়সী লিশিয়া এডওয়ার্ডসকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। সে সময় বেথিয়ার বয়স ছিল বিশের কোঠায়।
ফাঁসির দৃশ্য দেখতে নদীতীরবর্তী এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন আনুমানিক ২০ হাজার মানুষ। অনেকে ভালো জায়গা পেতে আগের রাতেই সেখানে অবস্থান নেন। ফাঁসিকে ঘিরে উৎসবের মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। দর্শকদের কাছে পপকর্ন ও কোমল পানীয়ও বিক্রি করা হয়।
ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত হয়ে ওঠে। ফাঁসিকে ঘিরে মানুষের উন্মাদনা ও উৎসবমুখর আচরণ সমাজের একটি অংশকে বিব্রত করে। এর প্রায় ১৮ মাস পর কেনটাকিতে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিষিদ্ধ করা হয়।
১৯৩৭ সালে মিসৌরিতে কয়েক শ মানুষের উপস্থিতিতে আরেকটি ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল। বিবিসির প্রতিবেদনে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের শেষ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর দীর্ঘ সময় এ ধরনের আয়োজন দেখা যায়নি।
কী ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী?
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ঘোষণা দিয়েছেন, নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এ ক্ষেত্রে ফায়ারিং স্কোয়াড বা গুলিবর্ষণকারী দলের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
হেগসেথের যুক্তি, গুরুতর অপরাধের পরিণতি মানুষকে বোঝানো প্রয়োজন। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সম্প্রচার করাই কি শাস্তির গুরুত্ব বোঝানোর উপযুক্ত উপায়?
তাদের আশঙ্কা, এমন সম্প্রচার মৃত্যুদণ্ডকে জনসমক্ষে প্রদর্শনীতে পরিণত করতে পারে। প্রযুক্তির কারণে ঘটনাটি সরাসরি অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।
মৃত্যুদণ্ডের প্রতি সমর্থন কমছে
কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মাইকেল রাডেলের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের প্রতি জনসমর্থন গত কয়েক দশকে কমেছে। বিবিসির প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ডের প্রতি সমর্থন ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে ৫২ শতাংশে নেমেছে।
রাডেল মনে করেন, প্যারোল ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো বিকল্প শাস্তি বিবেচনায় এলে মৃত্যুদণ্ডের প্রতি মানুষের সমর্থন কমতে পারে। এ ধরনের সাজায় দণ্ডিত ব্যক্তির সাধারণত মুক্তি পাওয়ার সুযোগ থাকে না।
তবে মৃত্যুদণ্ডের প্রতি সমর্থনের পরিসংখ্যান থেকে সরাসরি সম্প্রচারের বিষয়ে মানুষের মতামত নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় না। এ বিষয়ে মার্কিন জনগণের প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
শাস্তি, নাকি বিনোদন?
রাডেলের মতে, মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা শাস্তির উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তার আশঙ্কা, এমন উদ্যোগের ফলে মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর বিষয়ও মানুষের কাছে বিনোদনের উপকরণ হয়ে উঠতে পারে।
বেথিয়ার ফাঁসি নিয়ে গবেষণা করা লেখক সোনিয়া লিয়াও ১৯৩৬ সালের ঘটনাটিকে নিষ্ঠুরতার এক প্রদর্শনী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার পরিবারের সদস্যরাও সেই ফাঁসি দেখতে যাওয়া মানুষের মধ্যে ছিলেন। পরে পরিবারের একজনের লেখা বিবরণ থেকে তিনি ঘটনাটির ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে পারেন।
লিয়াওর মতে, অতীতে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড ঘিরে যে নিষ্ঠুর ও উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তা আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজনৈতিক মেরুকরণও কি ভূমিকা রাখছে?
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সহিংস বক্তব্যের প্রভাবও এ বিতর্কে উঠে এসেছে। ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক কার্ট গ্রের মতে, কিছু মানুষ সহিংস শাস্তির দৃশ্য দেখতে আগ্রহী হতে পারেন। তবে অন্যদের মধ্যে অনীহা বা উদাসীনতাও থাকতে পারে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো বিষয়ে মানুষের নীরবতাকে সরাসরি সমর্থন হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বরং রাজনৈতিক পরিবেশ ও সহিংসতার প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়া কীভাবে বদলাচ্ছে, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলে ক্যাম্পাসের সহিংসতা প্রতিরোধ গবেষণা কর্মসূচির পরিচালক গ্যারেন উইন্টিমিউট মনে করেন, জরিপের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রে সহিংসতার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে আসার ইঙ্গিত দেয়। তার মতে, প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যুক্তরাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ট্রাম্পের সমর্থন, দেখবেন না ভ্যান্স
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, তিনি নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য দেখবেন না। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ সিদ্ধান্তে তার সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। তবে তিনি নিজে সম্প্রচারটি দেখবেন কি না, সে বিষয়ে সরাসরি উত্তর দেননি।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, হাসানের মৃত্যুদণ্ডকে তিনি উপযুক্ত শাস্তি বলে মনে করেন। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য জনসমক্ষে সম্প্রচার করা উচিত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, নাকি সহিংসতার প্রদর্শনী?
যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ইতিহাস দেখায়, একসময় এ ধরনের ঘটনা জনসমাগম ও কৌতূহলের বিষয় হলেও পরে তা নিষিদ্ধ করা হয়। রেইনি বেথিয়ার ফাঁসিকে ঘিরে মানুষের উন্মাদনা সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রশ্ন মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করলে অপরাধ প্রতিরোধ ও শাস্তির গুরুত্ব বোঝানোর লক্ষ্য কতটা পূরণ হবে? নাকি এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সহিংসতার প্রতি আকর্ষণ বাড়বে এবং রাষ্ট্রীয় শাস্তি বিনোদনের উপকরণে পরিণত হবে?
মৃত্যুদণ্ডের সমর্থকেরা গুরুতর অপরাধের কঠোর শাস্তি ও ন্যায়বিচারের বিষয়টি সামনে আনেন। অন্যদিকে, বিরোধীরা মানবিক মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা এবং প্রকাশ্যে শাস্তি প্রদর্শনের সামাজিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
প্রায় এক শতাব্দী আগে হাজার হাজার মানুষকে ফাঁসি দেখতে ঘটনাস্থলে যেতে হয়েছিল। এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন দৃশ্য মুহূর্তেই বহু মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। ফলে বিতর্কটি শুধু মৃত্যুদণ্ডের যথার্থতা নিয়ে নয়; রাষ্ট্র কীভাবে শাস্তি কার্যকর করবে এবং সমাজ সহিংসতার সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
Comments