খেলাপি ঋণ কমাতে তিন ধাপে পরিকল্পনা বাংলাদেশ ব্যাংকের
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ আদায় বাড়ানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ আদায়ে গতি আনা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধের প্রবণতা বাড়ানোই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
পরিকল্পনার আওতায় খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম তদারকি, ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, ভালো গ্রাহকদের প্রণোদনা দেওয়া এবং ব্যাংক খাতের আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চতুর্থ বৈঠকে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের এসব পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এক বছরের মধ্যে খেলাপি ঋণ আদায়ে নজরদারি
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক বছরের মধ্যে যেসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রতি তিন মাস অন্তর বৈঠক করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বৈঠকে ঋণ আদায়ের বাধাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে বলা হবে। পাশাপাশি ব্যাংকার্স সভায় শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।
যেসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার বেশি, তাদের জন্য ঋণ আদায়ের বিশেষ নির্দেশিকা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিদ্যমান নির্দেশিকাও হালনাগাদ করা হবে।
ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান বা আইএফআরএস-৯ অনুসরণ করে প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি নিরূপণের পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় ঋণ থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি আগেভাগে হিসাব করা এবং সে অনুযায়ী অর্থ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের তালিকা প্রকাশের আইনগত দিকগুলোও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম বলেছেন, ব্যাংক খাতে ঋণগ্রহীতাদের ছাড় দেওয়ার প্রচলিত প্রবণতা ধীরে ধীরে বন্ধ করা জরুরি। খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া দ্রুত করতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা উভয় পক্ষকে কার্যকর সমাধানের দিকে উৎসাহিত করতে উপযুক্ত প্রণোদনা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের প্রণোদনা
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে খেলাপি ঋণ আদায়ে ভালো ফল করা ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রণোদনা দেওয়ার নীতিমালা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের।
এর মাধ্যমে ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের সক্রিয়তা বাড়ানো এবং ব্যাংকগুলোর অর্থ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম আরও গতিশীল করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ভালো গ্রাহকদের জন্য বিদ্যমান প্রণোদনা নীতিমালা পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা হবে। এতে গ্রাহকদের সময়মতো ঋণ পরিশোধে উৎসাহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে ঋণ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে ব্যাংকগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনা কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঋণ অনুমোদন, তদারকি, আদায় ও শ্রেণিকরণের প্রতিটি ধাপে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ তৈরির পেছনে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ ঋণ খেলাপি হওয়ার পর শুধু আদায় কার্যক্রম জোরদার নয়, বরং ঋণ দেওয়ার শুরু থেকেই ঝুঁকি চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এটি মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ।
এর আগে গত ৩১ মার্চ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ।
অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ১৩১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। একই সময়ে মোট ঋণের তুলনায় খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।
খেলাপি ঋণের এই চাপ মোকাবিলায় আদায় কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের আইনি কাঠামো সংস্কারের কাজও চলছে।
ব্যাংক ও অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের উদ্যোগ
ব্যাংক খাতে সুশাসন জোরদার করতে ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার পর খসড়াটি সংশোধন করে গত ২৪ আগস্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে সর্বশেষ আন্তঃমন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ২০ সেপ্টেম্বর।
এ ছাড়া ঋণ আদায় প্রক্রিয়া কার্যকর করতে অর্থঋণ আদালত (সংশোধন) আইন, ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ চলছে। এ লক্ষ্যে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এর আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ একটি কমিটি গঠন করে আইনের সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করে। বর্তমানে সংশোধিত খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নতুন দেউলিয়াত্ব আইন প্রণয়নের কাজ চলছে
খেলাপি ঋণ আদায় বাড়াতে 'দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬' প্রণয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি ১৯৯৭ সালের বিদ্যমান দেউলিয়াত্ব আইন আধুনিকায়ন করে 'দেউলিয়াত্ব ও দেউলিয়া কার্যক্রম আইন, ২০২৬' প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেউলিয়াত্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক করা, আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করার লক্ষ্য রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসির সহায়তায় নতুন দেউলিয়াত্ব আইনের ইংরেজি খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। খসড়াটি বাংলায় অনুবাদের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইএফসির সহায়তা চেয়েছে। বাংলা সংস্করণ চূড়ান্ত হওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে তা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে খেলাপি ঋণ আদায়ে তদারকি বাড়ানো, ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধে গ্রাহকদের উৎসাহিত করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে আইনি সংস্কার ও ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদারে সহায়তা মিলতে পারে।
Comments