সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে উত্তাল দিল্লি, মোতায়েন ২৫ হাজার নিরাপত্তাকর্মী
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রস্তাবিত ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ ঘিরে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শহরজুড়ে প্রায় ২৫ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ও সীমান্ত এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ৪৫টি মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও বেরোনোর পথ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে ২৫৪টি ট্রেন। কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও।
শনিবার (১০ অক্টোবর) প্রস্তাবিত এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুক্রবার রাত থেকেই রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। যন্তর মন্তরের আশপাশে বসানো হয়েছে একাধিক স্তরের ব্যারিকেড। মধ্য দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাড়ানো হয়েছে পুলিশি তৎপরতা। সম্ভাব্য জমায়েত ও যানজট মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন।
বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ
যন্তর মন্তরে সিজেপির প্রস্তাবিত বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। প্রশাসনিক অনুমতির অভাব, অতীতের আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা এবং বড় জমায়েতের কারণে নিরাপত্তা ও যান চলাচলে বিঘ্নের আশঙ্কার কথা জানিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে অনুমতি না পাওয়ার পরও দলের সমর্থকেরা রাজধানীতে প্রবেশ করে জমায়েতের চেষ্টা করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন। এ কারণে দিল্লির সীমান্ত এলাকায় গাড়িতে তল্লাশি এবং সন্দেহজনক গতিবিধির ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন ৯ অক্টোবর দেশের সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশপ্রধানদের চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য জমায়েতের বিষয়ে সতর্ক থাকার পাশাপাশি দিল্লি পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও সীমান্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দেড় কিলোমিটার এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা
যন্তর মন্তর, জনপথ, নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় এবং দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তর ঘিরে প্রায় দেড় কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে বিশেষ নিরাপত্তার আওতায় রাখা হয়েছে। এই এলাকায় ছয় হাজার ৫০০ জনের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।
যন্তর মন্তরমুখী সড়কগুলোতে তৈরি করা হয়েছে অন্তত সাত স্তরের ব্যারিকেড। নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে নয়াদিল্লি জেলাকে ২০টির বেশি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশকে সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১২০টিরও বেশি কোম্পানি মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্ভাব্য বিক্ষোভে আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য ১২টি আটককেন্দ্রও প্রস্তুত করেছে পুলিশ। নিরাপত্তাকর্মীদের সংযত থেকে পেশাদারত্বের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উসকানির মুখেও যেন তারা উত্তেজিত হয়ে প্রতিক্রিয়া না দেখান, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
৩০০ সিসিটিভি ক্যামেরায় নজরদারি
নয়াদিল্লি জেলার স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিংয়ের সুবিধাসহ ৩০০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা কার্যক্রম নথিবদ্ধ করতে জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য বডি ক্যামেরার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
পরিস্থিতির গতিবিধি ও পুলিশের পদক্ষেপ রেকর্ড করতে প্রায় ১০০ জন আলোকচিত্রী ও ভিডিওগ্রাফারকে কাজে লাগানোর কথা জানানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভে লোক জড়ো করার প্রচেষ্টা শনাক্ত করতে বিভিন্ন পোস্ট ও বার্তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ কাজে ২০০ জনের বেশি কনটেন্ট নির্মাতাকে নজরদারির আওতায় রাখার তথ্যও সামনে এসেছে।
নিরাপত্তা নির্দেশনা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে কমিউনিটি সেন্টার, মসজিদ ও আবাসিক কল্যাণ সমিতির মাধ্যমেও প্রচার চালাচ্ছে পুলিশ।
৪৫টি মেট্রো স্টেশনে বিধিনিষেধ
নিরাপত্তার কারণে দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশনে প্রবেশ ও বেরোনোর পথ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথমে ৫৭টি স্টেশনে বিধিনিষেধের কথা জানানো হলেও পরে তা কমিয়ে ৪৫টিতে আনা হয়।
৯ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকার কথা। তালিকায় রয়েছে জনপথ, প্যাটেল চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, রাজীব চক, নয়াদিল্লি, মান্ডি হাউস, আইটিও, খান মার্কেট, হাউজ খাস, লাজপত নগর ও কাশ্মীরি গেটসহ গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন।
বিধিনিষেধের আওতায় থাকা স্টেশনগুলোতে ট্রেন পরিবর্তনের সুবিধা সাধারণভাবে চালু রাখার কথা জানানো হয়েছে। তবে নয়াদিল্লি স্টেশনে এই সুবিধাও বন্ধ থাকবে।
এদিকে, মেট্রো চলাচল পুরোপুরি বন্ধ না করে পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সাধারণ যাত্রী, কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াত যাতে অযথা ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাতিল ২৫৪টি ট্রেন, প্রভাব পড়েছে রেল যোগাযোগে
বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রভাব পড়েছে রেল পরিষেবায়ও। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর সকাল ৪টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মোট ২৫৪টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫টি মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেন এবং ১৭৯টি লোকাল ট্রেন রয়েছে।
এই সিদ্ধান্তে দিল্লির সঙ্গে গাজিয়াবাদ, মিরাট, পানিপথ ও কুরুক্ষেত্রের মতো এলাকার রেল যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে যাত্রা করা যাত্রীদের ট্রেনের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুরনো দিল্লি, আনন্দ বিহার ও দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন চালু রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া, নমো ভারত রেলের সরাই কালে খান ও নিউ অশোক নগর স্টেশন নির্ধারিত সময়ের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
৩০টি সড়কে যান চলাচলে প্রভাবের আশঙ্কা
দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ প্রায় ৩০টি সড়ক চিহ্নিত করেছে, যেখানে ১০ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে যান চলাচলে প্রভাব পড়তে পারে। যন্তর মন্তর, কনট প্লেস, মান্ডি হাউস, প্যাটেল চক, অশোকা রোড, জনপথ, লোধি রোড ও ধৌলা কুয়োর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি অনুযায়ী যান চলাচলের পথ পরিবর্তন করা হতে পারে। তবে সব রাস্তা একযোগে বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই।
অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলতে এবং জরুরি কাজে বের হলে হাতে অতিরিক্ত সময় রাখতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে রেলস্টেশন, আন্তঃরাজ্য বাস টার্মিনাল ও বিমানবন্দরে যাওয়ার ক্ষেত্রে যাত্রীদের আগেভাগে পরিকল্পনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বন্ধ মদের দোকান, প্রভাব পড়তে পারে ব্যবসায়
নিরাপত্তাজনিত সতর্কতার অংশ হিসেবে ৯ ও ১০ অক্টোবর দিল্লির খুচরা মদের দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কনট প্লেসের নিউ দিল্লি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনও ১০ অক্টোবর দোকান, অফিস, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছে। ভাগীরথ প্যালেস ও চাঁদনি চক বাজার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও বাজার বন্ধ রাখার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
সম্ভাব্য যানজট ও চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উত্তরপ্রদেশেও সতর্কতা
দিল্লির পাশাপাশি প্রতিবেশী উত্তরপ্রদেশেও নিরাপত্তা সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। দিল্লি-সংলগ্ন মিরাট ও বেরেলি জোনের জেলাগুলোকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। রাজধানীমুখী সড়কগুলোতে গাড়ি পরীক্ষা ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
লখনউ, আগ্রা, মিরাট, বেরেলি, গাজিয়াবাদ, নয়ডা, প্রয়াগরাজ ও বারাণসীতে সম্ভাব্য বিক্ষোভ কর্মসূচির ওপর নজর রাখছে প্রশাসন। গৌতম বুদ্ধ নগর জেলায় ১০ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে, দিল্লি ও লখনউয়ের মধ্যে চলাচলকারী একাধিক ট্রেনও বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লখনউ মেল ও নয়াদিল্লি-লখনউ এসি সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস। ১১ অক্টোবরের লখনউ-নয়াদিল্লি গোমতী এক্সপ্রেস বাতিলের কথাও জানানো হয়েছে।
স্বাভাবিক জনজীবন বজায় রাখাই চ্যালেঞ্জ
সিজেপির প্রস্তাবিত বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে নেওয়া ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা রাজধানীর বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। মেট্রো ও রেল যোগাযোগ, সড়কে যান চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত সব ক্ষেত্রেই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
অনুমতি না পাওয়া সত্ত্বেও সমর্থকেরা জমায়েতের চেষ্টা করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন। ফলে নিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচল যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখাই এখন কর্তৃপক্ষের বড় চ্যালেঞ্জ।
Comments