দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির চাপে বাড়ছে দারিদ্র্য- বিশ্বব্যাংক
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে এবং এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের রেকর্ড বৃদ্ধি ও মূলধন ঘাটতি অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' শীর্ষক প্রতিবেদনে অর্থনীতির এমন এক নাজুক চিত্র উঠে এসেছে। 'মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর' শিরোনামের এই প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কর-রাজস্ব বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে ধীরগতি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র ৩.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ মহামারি-পূর্ববর্তী সময়ে এই প্রবৃদ্ধির হার অনেক উঁচুতে ছিল। করোনার পর গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ২.২ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এই ধীরগতির প্রধান কারণ হলো বেসরকারি ও সরকারি উভয় খাতের বিনিয়োগের সংকোচন। আলোচ্য অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪.৮ শতাংশ। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প পর্যালোচনা এবং বাস্তবায়ন ক্ষমতার দুর্বলতার কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নও ইতিহাসের অন্যতম নিচু পর্যায়ে নেমেছে।
শিল্প উৎপাদন ও শ্রমবাজারে ধাক্কা
গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাবে অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ ক্ষমতার নিচে উৎপাদনে বাধ্য হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়ে দিয়েছে কিংবা কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে। শিল্প ও সেবা খাতের এই মন্দার প্রভাবে শ্রমবাজারও সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে চাকরি হারানো অনেক নারী শ্রমবাজার ছেড়ে চলে যাওয়ায় নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
দারিদ্র্য ও মূল্যস্ফীতির চাপ
গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৭ শতাংশে নামলেও বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির বর্ধিত দাম এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমেনি। কম আয়ের শ্রমিকদের মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় তাদের প্রকৃত আয় ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে। এর ফলে জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়ে আনুমানিক ২২.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। একই সঙ্গে সমাজে আয়বৈষম্যও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যাংক খাতের গভীর সংকট
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ব্যাংক খাত। ২০২৬ সালের জুনে এসে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হার রেকর্ড ৩৩.২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ ৫৮.৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে তা ৪৩.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার নীতিগত সীমার অনেক নিচে নেমে গেছে। এদিকে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে (৪.৫%) নেমে এলেও বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস
সরকার সামাজিক সুরক্ষা ও বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করলেও এর একটি বড় অংশ প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায় না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক সচ্ছল পরিবার এই সুবিধা পেলেও দরিদ্রতম বহু পরিবার এর বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দুই বছরও (২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছর) বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ থেকে ৩.৯ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রধান সুপারিশসমূহ
অর্থনীতিকে এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্বব্যাংক কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে:
ব্যাংক খাত সংস্কার: ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান দ্রুত পর্যালোচনা করে প্রকৃত লোকসান শনাক্ত করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া বন্ধ করা।
জ্বালানি নিরাপত্তা: দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও এলএনজি অবকাঠামো বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ খাতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা।
রাজস্ব বৃদ্ধি: করনীতি ও কর প্রশাসন আলাদা করা, কর ফাঁকি রোধ করা এবং অকার্যকর করছাড় পর্যায়ক্রমে কমানো।
লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা: সাধারণ ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি সহায়তা কর্মসূচি জোরদার করা।
Comments