জ্বালানি,মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের চাপে অর্থনীতি
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে দেশের অর্থনীতি নতুন করে চাপে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে। এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকি মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো, বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভোগ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফের বোর্ড সভায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে বিদ্যমান ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্কতার কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের ২০২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করেছে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এই পূর্বাভাস কমানোয় অর্থনীতির শ্লথগতির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় নতুন চাপ তৈরি করেছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। গত ২১ সেপ্টেম্বর ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাবে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কৃষি, শিল্প ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়ও ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে প্রথমে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, এরপর বাড়ে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন খরচ। শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর। ফলে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। আইএমএফের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক পণ্যের দাম ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ও ভর্তুকি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে। এডিবিও মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে আঞ্চলিক অর্থনীতির অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদহার বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণের খরচ বেশি থাকায় ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারেন উদ্যোক্তারা। আবার বিনিয়োগ বাড়াতে সুদহার কমালে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর মধ্যে নীতিনির্ধারকদের কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও বড় সমস্যা। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংস্কার ও পুনর্গঠন না হলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করা কঠিন। আর ঋণপ্রবাহ দুর্বল থাকলে শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। আইএমএফও আর্থিক খাতের সংস্কার ও ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা দূর করাকে জরুরি বলে মনে করেছে।
জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের সংকট পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং উদ্যোক্তাদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে বাজারের চাহিদা দুর্বল করে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগেও অনিশ্চয়তা বাড়ে।
তাই অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির দিকে সমন্বিতভাবে নজর দিতে হবে। উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
Comments