দুই দশক পর ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনা, ইরান-ইরাক সমীকরণে নতুন বার্তা
দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাক থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার করতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের আবহের মধ্যেই বাগদাদের মাটি থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালের মধ্যে ইরাকে থাকা শেষ মার্কিন ঘাঁটিগুলি থেকেও সেনা সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন।
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন বাগদাদ সরকারের সঙ্গে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে একটি চুক্তি করেছিল। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সেই চুক্তিই বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছে।
এই প্রত্যাহারের সময়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর বার্তা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এমন পরিস্থিতিতে ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনী সরে গেলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সামরিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, ইরাক থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমে যাওয়া তেহরানের কৌশলগত পরিসর বাড়াতে পারে।
ইরাকে সক্রিয় ইরানপন্থী শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। 'পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স' (পিএমএফ) ইরাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সশস্ত্র জোট। এর পাশাপাশি ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা কাতেইব হিজবুল্লার মতো গোষ্ঠীও ইরাকে সক্রিয়। সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর পশ্চিম এশিয়ায় অবশিষ্ট মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলিকে লক্ষ্য করে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলি আরও সক্রিয় হতে পারে।
ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চলে পিএমএফের উপস্থিতি রয়েছে, বিশেষ করে ইরান-ইরাক সীমান্তবর্তী এলাকাতেও তাদের তৎপরতা রয়েছে। মসুল, কিরকুক, বডরা ও নাসিরিয়ার মতো এলাকায় মার্কিন সামরিক স্থাপনা ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে সতর্কতা জারি হয়েছে।
ইরাকি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, মার্কিন বাহিনী সম্পূর্ণভাবে সরে গেলে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বিশেষ করে ইরানপন্থী শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির তৎপরতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন। তবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরানের পক্ষে কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলির নেতারাও। 'ইরাকি ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স'-এর কমান্ডার আবু মোজতবা আল-ইয়াসিরি মঙ্গলবার এই প্রত্যাহারকে 'ঐতিহাসিক বিজয়' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সূচনা ২০০৩ সালে। ওই বছরের মার্চে সাদ্দাম হুসেনের সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে 'অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম' শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তী সময়ে ইরাকে আল-কায়দা, ইসলামিক স্টেট (আইএস) এবং বিভিন্ন ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্ত ছিল মার্কিন বাহিনী।
দীর্ঘ দুই দশকের এই সামরিক অধ্যায়ে বিপুল প্রাণহানি হয়েছে। বিভিন্ন হিসাবে, ইরাক যুদ্ধ ও পরবর্তী সংঘাতপর্বে প্রায় ৪,৫০০ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
এখন ইরাক থেকে মার্কিন সেনার পূর্ণ প্রত্যাহার পশ্চিম এশিয়ার পরিবর্তিত নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা ফের বাড়ছে, তখন ইরাকের মাটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অবসান আঞ্চলিক শক্তিগুলির পারস্পরিক সমীকরণে কী প্রভাব ফেলে, সে দিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
Comments