হুতিদের ঝটিকা আক্রমণে অরক্ষিত সৌদি আরব, সাহস বাড়ল ইরানের
লোহিত সাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি সংলগ্ন কৌশলগত ভূখণ্ড এবং আশপাশের দ্বীপগুলো সম্প্রতি দখল করে নেওয়ার পর ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা মক্কার খুব কাছে আক্রমণ করেছে। ইয়েমেনে দীর্ঘ দিন ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে এটি সৌদি আরবের জন্য গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও মারাত্মক সামরিক আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পরাজয় সৌদি আরবের গোয়েন্দা ব্যর্থতা, ইয়েমেনি মিত্রদের দ্রুত পতন এবং মার্কিন নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে।
গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও মিত্রদের পতন
সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুতিদের অগ্রযাত্রার মুখে কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি। পশ্চাদপসরণের সময় তারা বিপুল পরিমাণ উন্নত মার্কিন ও সৌদি সামরিক অস্ত্রশস্ত্র ফেলে রেখে যায়, যা এখন হুতিদের দখলে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রায় ১ লাখ যোদ্ধা নিয়ে গোপনে প্রস্তুতি নিচ্ছিল হুতিরা, যা সৌদি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্পূর্ণ অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইউএই ভিত্তিক বিশ্লেষক আবদুলখালেক আবদুল্লাহ বলেন, "সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। তারা বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি।"
আন্তর্জাতিক ও পশ্চিমা সহযোগিতার অভাব
সৌদি আরবকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় মিত্ররা সরাসরি কোনো সামরিক সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। এমনকি সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সামুদ্রিক জোটের সঙ্গেও ওয়াশিংটন যুক্ত হয়নি। পশ্চিমা সামরিক সহায়তার অনুপস্থিতি রিয়াদের নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
বিশ্লেষক ফারেয়া আল-মুসলিমির মতে, সৌদি ভূখণ্ড রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের এগিয়ে না আসাটা হলো দশকের পর দশক ধরে চলে আসা "সৌদি-মার্কিন নিরাপত্তা সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ব্যাঘাত"।
মিসরের দ্বারস্থ সৌদি আরব
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে অস্বীকার করায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) কায়রো সফর করেন। লোহিত সাগরে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনি মিসরের সামরিক ও নৌ সহায়তা চেয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালেও মিসর বাব আল-মান্দেব প্রণালি সুরক্ষায় ভূমিকা রেখেছিল।
ইরানের লাভ ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ
হুতিদের এই সাফল্য মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব ও অবস্থানকে বহুলাংশে শক্তিশালী করেছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ আগেই ছিল। এখন ইয়েমেনের মাধ্যমে বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আসায় বৈশ্বিক তেল ও জ্বালানি সরবরাহের দুটি অতি-গুরুত্বপূর্ণ জলপথেই ইরান ও তার মিত্রদের সরাসরি প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হলো।
গাজা, সিরিয়া ও লেবাননে নানামুখী চাপের পর ইয়েমেনে হুতিদের এই সাফল্যকে ইরানের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও সামরিক জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইয়েমেন: বহিরাগতদের জন্য "কবরস্থান"
ঐতিহাসিকভাবে ইয়েমেনকে বলা হয়ে থাকে বিদেশি শক্তির জন্য এক ফাঁদ বা কবরস্থান—যেমনটি ষাটের দশকে মিসরের জন্য, পরবর্তীতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের জন্য ঘটেছে। ফলে কোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক শক্তিই ইয়েমেনের এই জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে আর গভীরভাবে জড়াতে চাইছে না।
সৌদি আরব এখন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। একদিকে হুতিরা তাদের শর্ত মানতে (যেমন বিমানবন্দর ও বন্দরের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ) চাপ দিচ্ছে, অন্যদিকে বড় ধরনের পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নিলে রিয়াদের নিজেদের ভূখণ্ডেই হুতি হামলার আশঙ্কা বাড়ছে। মার্কিন নিরাপত্তা বলয় সংকুচিত হওয়া এবং মিত্রদের উদাসীনতায় মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে, আর অন্যদিকে কৌশলগত সুবিধা পেয়ে ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
Comments