ঋণের সুদ কমছে, কিন্তু অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে না
বাংলাদেশে ঋণের সুদের হার ক্রমেই কমছে। সাধারণভাবে ঋণের খরচ কমে আসাকে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হলেও দেশের বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য জমে থাকা, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা তলানিতে নেমে যাওয়া এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার কারণে সুদের হার কমছে। ফলে এই নিম্নমুখী প্রবণতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বার্তা না দিয়ে বরং অর্থনীতিতে গভীর স্থবিরতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঋণের চাহিদা তলানিতে
বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। গত জুনে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে, যা প্রায় ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোতে অর্থ থাকার পরও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন ঋণ নেওয়ার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না।
অন্যদিকে ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবাহ মোটামুটি স্বাভাবিক থাকায় ঋণ ও আমানতের মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে বসে থাকা ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে নিরাপদ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর ফলে সরকারি সিকিউরিটিজের চাহিদা বাড়লেও সেগুলোর রিটার্ন বা সুদের হার কমে এক অঙ্কে নেমে এসেছে।
ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্যের পাহাড়
২০২৬ সালের জুন নাগাদ ব্যাংকিং খাতে মোট অতিরিক্ত তারল্য ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে এই তারল্য বেড়েছে ৩৯.৪০ শতাংশ। ব্যাংকিং খাতে এই বিপুল অতিরিক্ত অর্থের বিপরীতে ঋণের চাহিদা না থাকাই সুদের হার কমার অন্যতম প্রধান কারণ। আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো আমানত ও ঋণের সুদের হার ইতিমধ্যে ১ থেকে ২ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়েছে।
বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকে আমানতের গড় সুদ প্রায় ৭ থেকে ৮ শতাংশ এবং ঋণের সুদ ১০ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। তবে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলো গ্রাহকের আমানত ধরে রাখতে এখনো তুলনামূলক বেশি—কখনো ১১ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে।
নীতি সুদহার কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক
ঋণের চাহিদা বাড়ানো এবং বিনিয়োগে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকও মুদ্রানীতিতে পরিবর্তন আনছে। গত জুলাইয়ে নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশ করা হয়। ২০২২ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবেই নীতি সুদহার বাড়িয়ে আসছিল। একপর্যায়ে তা ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশে পৌঁছায় এবং ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় দুই বছর তা উচ্চ পর্যায়ে রাখা হয়।
তবে উচ্চ সুদহার বজায় রেখেও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় কমানো সম্ভব হয়নি। বরং উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসার অর্থায়ন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপরও পড়েছে। এ কারণে এখন বাংলাদেশ ব্যাংক অপেক্ষাকৃত ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করছে—সুদের হার কমিয়ে উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় কমানো এবং সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা।
সস্তা ঋণেও বিনিয়োগ বাড়ছে না
সুদের হার কমে এলেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। এর পেছনে রয়েছে দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের নানা কাঠামোগত সমস্যা। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে।
ব্যাংকগুলো প্রতিযোগিতামূলক সুদে বড় করপোরেট গ্রাহকদের ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও গ্যাস সংকটসহ বিভিন্ন কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন ঋণ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে ব্যাংকের অতিরিক্ত অর্থ আবারও সরকারি সিকিউরিটিজে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে টাকা আছে, কিন্তু সেই টাকা উৎপাদনশীল বিনিয়োগে প্রবাহিত হচ্ছে না।
স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকি
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির সমন্বিত চিত্র নিয়ে। একদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আগস্টে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.২৬ শতাংশ দাঁড়ালেও ২০২৬–২৭ অর্থবছরের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশের তুলনায় এটি এখনো বেশি। ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নামেনি। মন্থর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেকারত্বের চাপ একসঙ্গে থাকায় অর্থনীতিতে 'স্ট্যাগফ্লেশন'-এর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
ডলার বাজারে বিপরীত চিত্র
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও এখন অতিরিক্ত সরবরাহের চাপ দেখা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত ডলার প্রবাহের বিপরীতে আমদানির চাহিদা কম থাকায় টাকার শক্তিশালী হওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে। রপ্তানিকারক ও প্রবাসী আয় প্রেরণকারীরা যাতে অতিরিক্ত শক্তিশালী টাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনা শুরু করেছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ৫০ মিলিয়ন ডলার কেনে। বাজারে রেমিট্যান্সের ডলারের দর তখন ছিল প্রায় ১২২ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৬০ পয়সা। ডলার বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই হস্তক্ষেপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর নাগাদ মোট রিজার্ভ দাঁড়ায় প্রায় ৩৬.৩৩ বিলিয়ন ডলারে, যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বেশি।
শুধু তারল্য বাড়িয়ে সমাধান সম্ভব নয়
বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচির মাধ্যমে বাজারে তারল্য সরবরাহ করছে এবং মুদ্রানীতি আরও শিথিল করার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের আশঙ্কা হলো, অর্থনীতির উৎপাদন সক্ষমতা না বাড়িয়ে শুধু বাজারে অর্থের জোগান বাড়ানো হলে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ তৈরি নাও হতে পারে।
বরং অতিরিক্ত তারল্য যদি উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে ভোগ বা সম্পদের বাজারে প্রবাহিত হয়, তাহলে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই অর্থনীতিতে চাহিদা তৈরির পাশাপাশি সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবসার খরচ কমানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা ছাড়া শুধু সুদের হার কমিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা কঠিন।
রাজস্ব নীতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর দায়িত্ব শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নয়। এখানে সরকারের রাজস্ব নীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কর ছাড়, অবকাঠামোগত ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে প্রকৃত চাহিদা সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
কারণ উদ্যোক্তার কাছে ঋণের সুদ কম হওয়াই যথেষ্ট নয়। তিনি যদি মনে করেন ব্যবসার পরিবেশ অনিশ্চিত, উৎপাদন ব্যয় বেশি এবং ভবিষ্যতে পণ্যের চাহিদা দুর্বল থাকবে, তাহলে কম সুদের ঋণও তিনি নিতে চাইবেন না।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ঋণের সুদের হার কমে আসা তাই সরল অর্থে সুখবর নয়। এর পেছনে রয়েছে বিপুল অতিরিক্ত তারল্য, দুর্বল ঋণ চাহিদা এবং বিনিয়োগের স্থবিরতা। অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে শুধু সুদের হার কমানো বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে তারল্য সরবরাহ বাড়ানো যথেষ্ট হবে না। বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি, জ্বালানি সংকট দূর করা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা কমানো এবং রাজস্ব নীতির কার্যকর ব্যবহার—সবকিছুর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় সস্তা ঋণ অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরির পরিবর্তে ব্যাংকগুলোতে আরও অতিরিক্ত অর্থ জমা হওয়ার পথই তৈরি করতে পারে। আর সেই পরিস্থিতিতে সুদের হার কমতে থাকবে ঠিকই, কিন্তু অর্থনীতির চাকা ঘুরবে না।
Comments