আমানত বাড়ছে মানেই ব্যাংক খাতের সব সমস্যা মিটে গেছে?
বাংলাদেশ ব্যাংক জানাচ্ছে, মানুষ আবার ব্যাংকমূখী হতে শুরু করেছে। নগদ টাকা ব্যাংকে ফেরাচ্ছে। জুনে এক মাসের ব্যবধানে মানুষের হাতে থাকা নগদ কমেছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংক আমানত বেড়েছে ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থের একটি অংশ আবার ব্যাংকে ফিরছে।
ব্যাংকে আমানত বাড়া মানে মানুষ কিছুটা বেশি টাকা ব্যাংকে রাখছে। এটি আস্থার ইতিবাচক সংকেত হতে পারে। কিন্তু শুধু আমানতের পরিমাণ বাড়লেই ব্যাংক খাতকে সুস্থ বলা যায় না। ব্যাংকের প্রকৃত স্বাস্থ্য নির্ভর করে সম্পদের মান, খেলাপি ঋণ, মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য, পরিচালনা ও সুশাসনের ওপরও।
ব্যাংকে টাকা জমা পড়ছে, কিন্তু সেই টাকা ঋণ হিসেবে কোথায় যাচ্ছে সেটিই বড় প্রশ্ন। ঋণ যদি অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ হয় বা আদায় না হয়, তাহলে আমানত বাড়লেও ব্যাংকের আর্থিক ঝুঁকি কমে না। বরং ভবিষ্যতে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে চাপ তৈরি হতে পারে।
উচ্চ সুদ মানুষকে ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহিত করতে পারে। অর্থাৎ আমানত বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হতে পারে রিটার্নের আকর্ষণ, ব্যাংকের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি আস্থা নয়। সুদের হার কমে গেলে বা অন্য কোথাও বেশি রিটার্নের সুযোগ তৈরি হলে এই আমানতের একটি অংশ আবার সরে যেতে পারে।
মানুষের হাতে থাকা নগদ ১২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা কমেছে এবং ব্যাংক আমানত ৩৮ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা বেড়েছে। কিন্তু এই দুই পরিবর্তনকে সরাসরি একে অপরের কারণ বলা যাবে না। আমানত বৃদ্ধির পেছনে নতুন সঞ্চয়,সুদ যোগ হওয়া,ব্যবসায়িক লেনদেন ও অন্যান্য আর্থিক প্রবাহও থাকতে পারে।
কিছু ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দুর্বল, তারল্য সংকট রয়েছে এবং আমানতকারীদের আস্থা নিয়েও প্রশ্ন ছিল। তাই সামগ্রিক আমানত বাড়লেও সব ব্যাংক সমানভাবে শক্তিশালী হয়েছে-এমন ধারণা করা ভুল। ভালো ব্যাংকে আমানত বাড়তে পারে,আবার দুর্বল ব্যাংক একই সময়ে সংকটে থাকতে পারে।
ব্যাংক খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হলো পরিচালনায় দুর্বলতা,অনিয়ম এবং জবাবদিহির ঘাটতি। এসব জায়গায় সংস্কার না হলে মানুষ সাময়িকভাবে বেশি সুদের জন্য টাকা রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের ওপর আস্থা নাও ফিরতে পারে। আস্থা শুধু সুদ দিয়ে তৈরি হয় না; নিরাপত্তা ও সুশাসনও প্রয়োজন।
ব্যাংকের কাছে কত টাকা আমানত আছে,তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রয়োজনে সেই টাকা নিরাপদে ও সময়মতো ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা। কোনো ব্যাংকের আমানত বাড়লেও যদি তার সম্পদের বড় অংশ খেলাপি ঋণে আটকে থাকে,তাহলে আমানত বৃদ্ধি আসলে ঝুঁকি কমানোর নিশ্চয়তা দেয় না।
সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা স্বল্পমেয়াদে আতঙ্ক কমাতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্ত না হলে শুধু সরকারি নিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করে আস্থা ধরে রাখা কঠিন। ব্যাংককে নিজস্ব সক্ষমতায় আমানতকারীর অর্থ সুরক্ষিত করার অবস্থায় যেতে হবে।
ব্যাংকে টাকা জমা পড়লেই অর্থনীতির জন্য তা ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না। ব্যাংক যদি সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ঋণ হিসেবে না দেয়, অথবা ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করে, তাহলে আমানত বৃদ্ধির অর্থনৈতিক সুফল সীমিত থাকবে।
এক মাসে আমানত বাড়া একটি ভালো লক্ষণ। কিন্তু এটি একটি ট্রেন্ড নাকি সাময়িক পরিবর্তন, তা বোঝার জন্য কয়েক মাসের তথ্য দেখতে হবে। পরপর কয়েক মাস আমানত বাড়া, খেলাপি ঋণ কমা, তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি এবং ব্যাংকের আর্থিক শৃঙ্খলা শক্ত হলে তখন আস্থা ফেরার বিষয়টি আরও জোরালোভাবে বলা যাবে।
আমানত বৃদ্ধি হলো ব্যাংক খাতের জন্য ভালো খবর, কিন্তু এটি সাফল্যের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। প্রকৃত সাফল্য তখনই,যখন আমানত বৃদ্ধির পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমবে, দুর্বল ব্যাংকগুলো সংস্কার হবে, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, আমানতকারীর অর্থ নিরাপদ থাকবে এবং ব্যাংকে জমা হওয়া অর্থ উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার হবে। অন্যথায় শুধু আমানতের পরিমাণ বাড়াকে ব্যাংক খাতের সংকট কাটার প্রমাণ হিসেবে দেখানো হবে অতিরঞ্জিত আশাবাদ।
Comments