দেশ ও জনগণের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষার সুযোগ আছে কি?
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ-কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক নাটকীয়তার মধ্যে ঢাকায় একটি বিপজ্জনক ঘটনা নাগরিকদের দৃষ্টির বাইরে চলে গেছে বলে প্রতীয়মাণ হচ্ছে।
আফগানিম্তান, পাকিস্তান নাইজেরিয়া, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ার মতো বাংলাদেশও কি তবে ইম্প্রোভাইস্ড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি বোমার যুগে প্রবেশ করেছে? নাগরিক সমাজ এখন এই প্রশ্ন করতে পারে। পাকিস্তানে এর প্রয়োগ ভয়ংকর। বলতে গেলে নিয়মিত এর বিষ্ফোরনের খবর পাওয়া যায় দেশটির সংবাদ মাধ্যমে।
রাজধানী ঢাকার হৃদপিণ্ড মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে সম্প্রতি একটি পরিত্যাক্ত ছাতার ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আইইডি বা হাতে তৈরি মারাত্মক বিস্ফোরক। এমন একটি জনবহুল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাদদেশে এই ধরনের আইইডির উপস্থিতি এক রূঢ় বাস্তবতাকে আমাদের চোখের সামনে উন্মোচন করেছে।
বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তা,এবং সাধারণ নাগরিকদের কথা ভাবলে এই ঘটনাকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। এটিকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন কোনো আইনি ঘটনা নয়। কোনো ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নয়,বরং অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিষয়টি ভাবা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য পাকিস্তানে যাতায়াত সহজ হয়েছে। পাকিস্তানে গিয়ে তেহরিক ই তালেবান,পাকিস্তান তথা টিটিপির হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে বাংলাদেশের কিছু তরুণের মৃত্যুর খবরও এসেছে ইতিমধ্যে।
তাই আইইডি - এই একটি মাত্র শব্দ এখন বড় ভাবনার বিষয়। এটি দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তাবোধকে ভাবিয়ে তুলেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে এই ধরনের মারণাস্ত্র তৈরিতে পারদর্শী ও প্রশিক্ষিত উগ্রবাদী গোষ্ঠীর বাংলাদেশে আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ার যেসব তথ্য চাউর হচ্ছিল,মতিঝিলের ঘটনাটি তারই এক বাস্তব বহিঃপ্রকাশ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিত্যক্ত ছাতাটি থেকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আইইডিটি সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করে। তবে এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য কেবল একটি আতঙ্ক সৃষ্টি করা ছিল কিনা;নাকি এর নেপথ্যে ছিল সুদূরপ্রসারী এক ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক ষড়যন্ত্র – সেটা এখন খতিয়ে দেখার বিষয়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ঘটনার সময়ে মতিঝিলের ওই নির্দিষ্ট পথ দিয়ে হিন্দুদের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রার শোভাযাত্রা অতিক্রম করার কথা ছিল। পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে,এই হামলাটি পরিকল্পিতভাবে ওই ধর্মীয় মিছিলকে টার্গেট করেই করা হয়েছিল।
তাহলে বলা যায় জঙ্গিদের লক্ষ্য ছিল-সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি করা,আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং সরকারকে নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কে বার্তা্ দেওয়া।
আইইডি হলো – দ্রুত তৈরি করা বোমা। সাধারণ পটকা নয়। আইইডি তৈরি করা কোনো সাধারণ অপরাধীর কাজ নয়; এর জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট কেমিক্যাল জ্ঞান,ইলেকট্রনিক সার্কিটের দক্ষতা এবং ডেটনেটিং ফিউজ ব্যবহারের বিশেষ প্রশিক্ষণ।
আইইডি কেন এত বিপজ্জনক? আইইডি হলো এমন একটি বিস্ফোরক ব্যবস্থা যা দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ বস্তুর (যেমন: বোতল, ব্যাগ, ছাতা, পাইপ) ভেতর লুকিয়ে রাখা যায়। এটি দূরনিয়ন্ত্রিত বা রিমোট কন্ট্রোল্ড,সময় নিয়ন্ত্রিত, অর্থাৎ টাইমার দেওয়া থাকে বা কোনো স্পর্শ/চাপের মাধ্যমে বিষ্ফোরণ ঘটানো সম্ভব। সিরিয়া,ইরাক,কিংবা আফগানিস্তানের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় উগ্রবাদীরা এই আইইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটিয়েছে। এখন পাকিস্তানে আইইডি এক বড় আতংক।
বিগত অন্তত দুই বছর ধরে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত এমন অনেক ব্যক্তি ও প্রশিক্ষক গোপনে বাংলাদেশে যাতায়াত করেছে বলে গোয়েন্দারা বলছেন। এরা স্থানীয় ছোট ছোট উগ্রবাদী সেলগুলোকে আইইডি তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়েছে। মতিঝিলে রেখে যাওয়া এই বোমাটি মূলত উগ্রবাদীদের পক্ষ থেকে একটি 'টেস্ট কেস'।
তারা দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা,রেসপন্স টাইম এবং জনসাধারণের সচেতনতা পরিমাপ করতেই এই মহড়াটি চালিয়েছে। এটি সংকেত দিচ্ছে যে,উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এখন আর নিষ্ক্রিয় নেই তারা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে। গত বছর ডিসেম্বরে,ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় একটি মাদ্রাসায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের কথা মনে থাকবার কথা। বিস্ফোরণে মাদ্রাসার একতলা ভবনের পশ্চিম পাশের দুটি কক্ষের দেয়াল উড়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে ককটেল,রাসায়নিক দ্রব্য ও বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাকাঠামো এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে। অনেককে জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বা অনেকে পালিয়ে গেছে যাদের বিরুদ্ধের জঙ্গিবাদের জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। এই জুলাই মাসেই দেশের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনী 'ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম' নামক একটি মারাত্মক উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক উন্মোচন করতে সক্ষম হয়।
ঘটনাপ্রবাহে মনে হচ্ছে – 'বাংলাদেশে আসলে কোনো জঙ্গি বা উগ্রবাদী নেই,এসবই বিগত শাসকগোষ্ঠীর তৈরি করা নাটক'-এরকম রাজনৈতিক বয়ান বিপদই ডেকে আনবে।
দেশের সার্বিক সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ তৎপরতা প্রয়োজন, যেন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে নিয়ে উগ্রবাদ যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।
Comments