রাজস্ব আদায় ও ব্যাংক সংস্কারে সরকারের সক্ষমতা জানতে চায় আইএমএফ
চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করায় তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এই বিষয়কে সামনে রেখে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে নতুন বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বৃদ্ধি, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচির ব্যয় নির্বাহে সরকারের আর্থিক সক্ষমতাও পর্যালোচনা করছে আইএমএফ।
আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, গ্যাস, সার, খাদ্যসহ বিভিন্ন খাতের ভর্তুকি পর্যালোচনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেন। পরদিন পৃথকভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আরও বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভর্তুকি কমাতে ব্যর্থতা, ব্যাংক খাতের সংস্কার, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার—এই চারটি বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, যেসব খাতে ধীরে ধীরে ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা ছিল, নতুন বাজেটে সেসব খাতে বরাদ্দ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া ভর্তুকি দ্রুত কমিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছে তারা।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সরকারের পদক্ষেপকে যথেষ্ট কার্যকর মনে করছে না আইএমএফ। তাদের মতে, সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে উন্নতি হলেও প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের গতি ধীর থাকায় ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি নিয়েও সংস্থাটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আইএমএফের পর্যবেক্ষণে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া উদ্যোগগুলো প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ, মূলধন ঘাটতি দূরীকরণ এবং সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মনে করে।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়েও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার তুলনায় কম এবং বাজেট ঘাটতির চাপ বিদ্যমান। এ অবস্থায় বড় আকারের বেতন বৃদ্ধি সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। পাশাপাশি বাজারে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন কিছু সময়ের জন্য স্থগিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে তারা।
রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কারেও অগ্রগতির ধীরগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। দীর্ঘদিন ধরে এনবিআরকে নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব সংগ্রহ—এই দুটি পৃথক কাঠামোয় পুনর্গঠনের সুপারিশ করে এলেও বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। সংস্থাটির মতে, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়া সরকারের রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত করা কঠিন হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলমান আলোচনা শেষে বাংলাদেশের সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি মূল্যায়ন করে আইএমএফ তাদের চূড়ান্ত মতামত ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবে।
Comments