চিমনির কালো ধোঁয়া থেকে ল্যাপটপের আলো: প্রলেতারিয়েতের নতুন মুখ
সাবঅল্টার্নের মতো 'প্রলেতারিয়েত' বা 'সর্বহারা'ও আজ নাগরিক চিন্তার অভিধানে আলোচিত বিষয়। কিন্তু একটি শব্দ কীভাবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ও আবেগগত আবেদন সৃষ্টি করে, সেই প্রশ্ন থেকে আলোচনা করা যেতে পারে।
বিংশ শতকের শেষ লগ্নটি ছিল এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের সাক্ষী। সোভিয়েতের পতন, চীনের বাজারমুখী রূপান্তর বা কিউবার ধারাবাহিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখে বিশ্বরাজনীতি যেন এক চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল: 'প্রলেতারিয়েত' বা সর্বহারা শ্রেণির ধারণা এখন অবান্তর।
কার্ল মার্ক্স যে শ্রেণিকে ইতিহাসের অবিনাশী চালিকাশক্তি বলে চিহ্নিত করেছিলেন, বিশ্বায়নের ঝোড়ো হাওয়ায় সেই শক্তি নাকি চিরতরে মঞ্চ হতে বিদায় নিয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্ত কি আসলে বাস্তবসম্মত, নাকি আকস্মিক ঐতিহাসিক ব্যর্থতা প্রসূত এক তড়িঘড়ি উপসংহার?
মার্ক্সীয় দর্শনে 'প্রলেতারিয়েত' কোনও সুনির্দিষ্ট পোশাকধারী বা কায়িক শ্রমিকের সমার্থক নয়। এর সংজ্ঞা নিহিত রয়েছে উৎপাদনের উপায়ের সাথে মানুষের অর্থনৈতিক সম্পর্কে। যার নিজস্ব পুঁজি বা উৎপাদনের উপাদান নেই, জীবনধারণের জন্য যাকে শ্রম বিক্রয় করতে হয়-সে-ই প্রলেতারিয়েত। এই নিরিখে কারখানার শ্রমিক এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের কর্পোরেট চাকুরিজীবী,কল সেন্টারের কর্মী বা পথচলতি ডেলিভারি বয়-সকলেই এক বন্ধনে আবদ্ধ। প্রলেতারিয়েত কোনও সুনির্দিষ্ট বৃত্তির নাম নয়, এটি এক অর্থনৈতিক অবস্থানের অভিজ্ঞান।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে পুঁজি করে পশ্চিমী দুনিয়া ঘোষণা করেছিলো 'ইতিহাসের সমাপ্তি'। সমাজতন্ত্রের পরাভবে উদারপন্থী গণতন্ত্র ও মুক্তবাজারের চূড়ান্ত জয় বিঘোষিত হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রের পতন আর শ্রেণির বিলুপ্তি এক বিষয় নয়। রোমান সাম্রাজ্যের পতনে কৃষকের অস্তিত্ব মুছে যায়নি। সোভিয়েত ভাঙলেও শ্রমজীবী মানুষের অবস্থানটি অনড়ই রয়ে গেছে।
চীনের দৃষ্টান্তটি আরও জটিল ও কৌতূহলোদ্দীপক। সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির একাধিপত্য বজায় থাকলেও অর্থনীতি আজ ঘোরতর বাজারমুখী। বেসরকারি পুঁজি, কর্পোরেট প্রতিযোগিতা এবং ধনকুবের শ্রেণির প্রাদুর্ভাব ঘটেছে প্রকাশ্যেই। অনেকেই একে পুঁজিবাদের নিকট সমাজতন্ত্রের আত্মসমর্পণ বলে থাকেন। কিন্তু এই ঢাকঢোলের অন্তরালে একটি তথ্য অনুচ্চারিতই থাকিয়া যায়-চীনের এই বিপুল শিল্পায়ন বস্তুত কোটি কোটি নতুন শ্রমিকের জন্ম দিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শ কতটা ক্ষুণ্ণ হয়েছে তা তর্কসাপেক্ষ, কিন্তু প্রলেতারিয়েতের সংখ্যা যে বিপুল বৃদ্ধি পেয়েছে, তা অনস্বীকার্য। কিউবার সংকটকেও সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার বিজ্ঞাপন হিসাবে খাড়া করা হয়। মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতায় জর্জরিত এই দ্বীপরাষ্ট্রে শ্রমজীবী মানুষের দৈন্যই আজ সর্বাপেক্ষা স্পষ্ট। অথচ, এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় শ্রেণির অস্তিত্বকে অস্বীকার করে না,বরং পুঁজির নিরিখে শ্রমিকের অসহায়তাকেই নগ্ন করে দেয়।
তবে সর্বহারার অস্তিত্ব নিয়ে যারা সংশয় প্রকাশ করেন, তাদের যুক্তি একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। বিংশ শতকের শ্রমিক সংহতির যে সুসংহত রূপ ছিল, আজ তা খণ্ডিত। বিশালাকায় কারখানার এক ছাদের তলায় শ্রমিকদের যে যৌথ চেতনা গড়ে উঠতো,বর্তমানের ডিজিটাল ও খণ্ডকালীন অর্থনীতিতে তা অদৃশ্য। একজন উবার চালক বা স্বাধীন ফ্রিল্যান্সার আজ নিজেকে 'শ্রমিক' হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত নন। শ্রেণি-চেতনার স্থান নিয়েছে পেশাগত পরিচিতি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক আত্মপরিচয়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার। শিক্ষা ও আধুনিক উপভোক্তা সংস্কৃতির হাত ধরে এমন এক বেতনভোগী শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যারা অর্থনৈতিক ভাবে শ্রমিক হলেও মনস্তাত্ত্বিক ভাবে নিজেদের স্বতন্ত্র ভাবতে ভালোবাসেন। মার্ক্সীয় মেরুকরণের তত্ত্বটিকে এই জটিলতা নিঃসন্দেহে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
এরপরও প্রশ্ন থাকে-প্রলেতারিয়েত যদি নাই থাকে, তবে এই পৃথিবীর সিংহভাগ মানুষ কারা? দুনিয়ার কারখানায়, প্রযুক্তি জগতে, পরিবহনে বা বহুজাতিক সংস্থায় যারা চাকা সচল রাখছেন, তাদের শ্রম ছাড়া এই প্রগতির প্রাসাদ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। মালিকানা ও শ্রমের সনাতন বিভাজনটি বিলুপ্ত হয়নি, বিশ্বায়নের হাত ধরে এটি আরও পরিব্যাপ্ত হয়েছে মাত্র।
সংকটটি তাই প্রলেতারিয়েতের অস্তিত্বের নয়, সংকটটি তার রাজনৈতিক রূপের। মার্ক্স যে অভিন্ন ও বিপ্লবী শ্রেণির স্বপ্ন দেখেছিলেন, জাতপাত, ধর্ম, জাতীয়তাবাদ ও অতি-উপভোক্তা সংস্কৃতির সুচতুর বিভাজনে আজ তা শতধাবিভক্ত। সম-অর্থনৈতিক অবস্থানে থেকেও মানুষ রাজনৈতিক ভাবে এক হতে পারছে না। আধুনিক বামপন্থার এটিই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
একবিংশ শতকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও গিগ অর্থনীতি এই শ্রেণি-প্রশ্নটিকে আবারও সম্মুখে এনে ফেলেছে। প্রযুক্তি উৎপাদন বাড়িয়ে সত্য, কিন্তু কর্মের নিশ্চয়তা কেড়ে নিয়ে তৈরি করেছে এক চরম অনিশ্চয়তা। মুষ্টিমেয় ধনকুবেরের হাতে সম্পদের পাহাড় আর বিপুল জনসমষ্টির প্রান্তিকতার এই চেনা ছবি মার্ক্সের পর্যবেক্ষণকেই নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে।
তাই, প্রলেতারিয়েত ফুরায়নি, তার রূপ বদলেছে। চিমনির কালোধোঁয়া মাখা শ্রমিকের স্থান নিয়েছে ল্যাপটপধারী ফ্রিল্যান্সার বা অ্যাপ-নির্ভর কর্মী। তারা নিজেদের 'সর্বহারা' বলে স্বীকার করুন বা না করুন, শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্বটি আধুনিক অর্থনীতির কেন্দ্রে আগের মতোই দেদীপ্যমান। 'প্রলেতারিয়েতের বিলুপ্তি' তাই কোনও সমাজবৈজ্ঞানিক সত্য নয়, বরং এক রাজনৈতিক হতাশারই প্রতিফলন। শ্রম বিক্রি করে বেঁচে থাকা মানুষকে ইতিহাস হতে মুছে ফেলা অসম্ভব। আসল প্রশ্ন এটাই নয় যে প্রলেতারিয়েত আছে কি নেই; আসল প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তিত ও খণ্ডিত পৃথিবীতে তারা নিজেদের অধিকারের নতুন ভাষা ও চেতনা খুঁজে পাবে কি না।
Comments