সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি: কমবে কী নিত্যপণ্যের দাম?
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি। গত চার বছর ধরে সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি, খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ বহন করছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য নীতিগত সুদের হার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখে আবারও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়-শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি কি বর্তমান পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে?
অর্থনীতির প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন নীতিগত সুদের হার বাড়ায় অথবা উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখে,তখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণের খরচ বেড়ে যায়। এর ফলে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কম ঋণ নেয়,বাজারে অর্থের প্রবাহ সীমিত হয় এবং অতিরিক্ত চাহিদা কমে আসে। চাহিদা কমলে মূল্যস্ফীতিও ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে। বিশ্বের অনেক দেশে এই নীতি সফলভাবে প্রয়োগ হয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতির চরিত্র কিছুটা ভিন্ন। এখানে মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ অতিরিক্ত চাহিদা নয়; বরং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা,জ্বালানি সংকট ও জ্বালানির দাম বাড়া,আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার, বাজারে অস্বচ্ছতা, সিন্ডিকেট, মজুতদারি এবং কৃষিপণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন। অর্থাৎ এটি মূলত ব্যয়জনিত ও কাঠামোগত মূল্যস্ফীতি। তাই শুধু সুদের হার বাড়িয়ে এই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকও তাদের সর্বশেষ মুদ্রানীতিতে স্বীকার করেছে যে,কেবল কঠোর মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা,সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা,রাজস্বনীতির সঙ্গে সমন্বয় এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া মূল্যস্ফীতিকে টেকসইভাবে কমানো কঠিন। এই স্বীকারোক্তি বাস্তবতার প্রতিফলন।
তবে বর্তমান মুদ্রানীতির সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব হলো,একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উচ্চ সুদের হার বজায় রেখে অর্থের প্রবাহ সীমিত করতে চায়,অন্যদিকে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বিপুল অঙ্কের তারল্য সহায়তা দিচ্ছে এবং উৎপাদন খাতকে সচল রাখতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। যদিও বলা হচ্ছে,এই অর্থ নতুন টাকা ছাপিয়ে নয়,ব্যাংকিং ব্যবস্থার উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে দেওয়া হবে;তবুও অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহিত হলে সংকোচনমূলক নীতির কার্যকারিতা কিছুটা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
অন্যদিকে,দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদের হার বজায় রাখারও কিছু নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারান।শিল্পপ্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণে পিছিয়ে যায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ গ্রহণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও মন্থর হয়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬.১ শতাংশ দিয়েছে, যা সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম।
তবে এটিও সত্য যে,বিনিয়োগ কমে যাওয়ার জন্য শুধু উচ্চ সুদের হার দায়ী নয়। দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক জটিলতা, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি এবং ব্যবসা পরিচালনার অতিরিক্ত ব্যয়ও বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান না করে শুধু সুদের হার কমিয়ে দিলেও বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়বে-এমন নিশ্চয়তা নেই।
মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন উচ্চ পর্যায়ে থাকলে এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ, নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রকৃত আয় কমে যায়,সঞ্চয় হ্রাস পায় এবং জীবনযাত্রার মান অবনতির দিকে যায়। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ শুধু অর্থনৈতিক নয়,সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিরিক্ত কঠোরতা আরোপ করা হয়, তাহলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান আরও কমে যেতে পারে। আবার দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই নীতিনির্ধারকদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সমন্বিত নীতির বিকল্প নেই। কার্যকর রাজস্বনীতি, বাজার তদারকি,কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানি ব্যবস্থার উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সিন্ডিকেট ও মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করে খেলাপি ঋণ কমানো জরুরি। এসব পদক্ষেপ ছাড়া মুদ্রানীতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা প্রত্যাশিত ফল দেবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে,আগামী মাসগুলোতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে আসবে। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে,গত তিন বছরেও উচ্চ সুদের হার মূল্যস্ফীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারেনি। ফলে এবারও একই নীতি অনুসরণ করে ভিন্ন ফল আশা করা কিছুটা কঠিন।
সবশেষে বলা যায়,বর্তমান পরিস্থিতিতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি প্রয়োজনীয় হলেও এটি কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। মূল্যস্ফীতির মূল কারণ যদি কাঠামোগত ও সরবরাহজনিত হয়, তাহলে শুধু সুদের হার উচ্চ রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। বরং প্রয়োজন কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়,বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ। বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা,উৎপাদন বৃদ্ধি,সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। তাই সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলেও,একে সফল করতে হলে এর সঙ্গে সমানতালে কাঠামোগত সংস্কার ও কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।
Comments