দেশের ব্যাংক খাত শক্তিশালী করতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের ভিত শক্তিশালীকরণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। গত ২৩ জুন ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক পর্ষদের সভায় এই অর্থায়ন অনুমোদন করা হয়।
'ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২' শীর্ষক এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা জোরদার করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা ও সার্বিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা। এটি দেশের ব্যাংক রেজোলিউশন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অনুমোদিত এই প্রকল্পটির মাধ্যমে আমানত সুরক্ষা তহবিলের মূলধন বৃদ্ধি করার পাশাপাশি আর্থিক খাতের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে—আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, একটি কার্যকর 'ইমার্জেন্সি লিকুইডিটি অ্যাসিস্ট্যান্স' (জরুরি তারল্য সহায়তা) কাঠামো প্রতিষ্ঠা, ব্যাংক পুনর্গঠন কৌশল তৈরি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কারে সরাসরি সহায়তা প্রদান।
বিশ্বব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, রেগুলেটরি ক্যাপচার এবং বেনামি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে ঋণ প্রদানের মতো বড় বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২.৬ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশীয় ব্যাংকগুলোর গড় ৭.৯ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুরো ব্যবস্থার ঝুঁকি-ভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জঁ পেম বলেন, "এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনে বাংলাদেশের লক্ষ্যমাত্রার জন্য একটি স্থিতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক খাত প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাংক খাত—যা মোট আর্থিক খাতের সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশের যোগান দেয়—বর্তমানে ক্রমবর্ধমান চাপের সম্মুখীন এই প্রকল্পটি ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা ও আস্থা ফেরাতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, পদ্ধতি এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। এর ফলে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরবে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।"
প্রকল্পটির আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামো আধুনিকায়ন ও উন্নত করা হবে। এটি ক্রমবর্ধমান সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা এবং খাতভিত্তিক ডেটা ও অ্যানালিটিক্স-এর ঘাটতিগুলো পূরণ করতে সাহায্য করবে। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা বাড়বে এবং তথ্য-নির্ভর ও ঝুঁকি-ভিত্তিক তদারকির মাধ্যমে আর্থিক খাতের স্থিতিস্থাপকতা উন্নত হবে।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞ এবং প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার তোশিয়াকি ওনো জানান, আইএমএফ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) অন্যান্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে একটি সমন্বিত পদ্ধতির অংশ হিসেবে এই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এটি সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি এবং ব্যাংক খাতের সামগ্রিক চাপ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সক্ষমতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে।
Comments