সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
দুই সপ্তাহের বেশি সময় পার হয়েছে—সরকার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পরিপত্রে বলা হয়েছে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও চেয়ারম্যান পদে কাজী শায়রুল হাসানকে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক/সিইও পদে আবেদুর রহমান সিকদারকে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এখনও পূর্ণ বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো ঠিক হয়নি। এ পর্যায়ে দেখা যেতে পারে সরকারি খাতে এই বিশাল ইসলামি ব্যাংকের চ্যালেঞ্জ কী কী?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে ২০২৫ সালের শেষ দিকে একটি নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। পাঁচটি দুর্বল ও সংকটাপন্ন ইসলামি ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক—একীভূত করে গঠন করা হয় নতুন 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি'। ৩০ নভেম্বর ২০২৫ বাংলাদেশ ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ডিসেম্বরের শুরু থেকে ব্যাংকটি কার্যক্রম শুরু করে। গ্রাহকসংখ্যা ও মূলধনের বিচারে এটি দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক।
অন্তর্বর্তী সরকার এটি গঠন করলেও শেষ পর্যন্ত এই ব্যাংক এসে পড়ে নতুন বিএনপি সরকারের হাতে। এসব ব্যাংকের গ্রাহকরা আমানতের অর্থ ফেরতসহ নানা দাবিতে চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেছেন। গ্রাহকদের অর্জিত মুনাফা কর্তনের জন্য 'হেয়ারকাট' নামক উদ্ভট মনসুরীয় পদ্ধতির প্রতিবাদও তারা করে আসছেন শুরু থেকে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় 'অপারেশন' হিসেবে পরিচিত 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি'। লাগাতার গ্রাহক আন্দোলন, আইনি মারপ্যাঁচ ও নানা বিতর্কে এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল এটি ভেস্তে যেতে বসেছে। তবে শেষ পর্যন্ত নতুন গভর্নর একীভূত করার সিদ্ধান্তেই অনড় থেকেছেন।
যাই হোক, শেষ পর্যন্ত আর্থিক খাতের দুজন অভিজ্ঞ ব্যক্তির নেতৃত্বে এই ব্যাংক যাত্রা শুরু করেছে। আমরা দেখব—চ্যালেঞ্জগুলো কী কী। এই বৃহৎ একীভূতকরণের সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি কঠিন বিষয় মোকাবিলার ওপর:
১. খেলাপি ঋণের পাহাড়
ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় সংকট বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ। একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওর বড় অংশই অনাদায়ী হয়ে পড়েছে। এসব ঋণের সঙ্গে দেশের প্রভাবশালী কিছু ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নাম জড়িত থাকায় অর্থ পুনরুদ্ধার কেবল আর্থিক নয়, আইনি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জও বটে। ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হলে ব্যাংকের আর্থিক পুনরুদ্ধার দীর্ঘায়িত হবে।
২. আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা
বিগত সময়ে আমানত তুলতে না পারার কারণে লাখো গ্রাহক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। ফলে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। নতুন ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আমানতকারীদের বিশ্বাস পুনর্গঠন এবং ধাপে ধাপে অর্থ ফেরতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন।
৩. প্রযুক্তিগত একীভূতকরণ
পাঁচটি পৃথক ব্যাংকের তথ্যভাণ্ডার, সফটওয়্যার, হিসাব ব্যবস্থা ও গ্রাহক তথ্য একত্র করা একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ। সামান্য ত্রুটিও গ্রাহকসেবা ব্যাহত করতে পারে। তাই আইটি সমন্বয় সফলভাবে সম্পন্ন করা ব্যাংকের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪. কার্যকর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা
একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য শক্তিশালী পরিচালনা পর্ষদ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ, সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা এবং বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্থায়ী নেতৃত্বের বিকল্প নেই।
৫. পুরোনো স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিরোধ
যেসব গোষ্ঠী অতীতে এসব ব্যাংকের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল, তাদের একাংশের পক্ষ থেকে সংস্কার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দৃঢ় অবস্থানে থাকতে হবে।
৬. পরিচালন ব্যয় ও কাঠামোগত সংস্কার
শত শত শাখা, উপশাখা ও এটিএম নিয়ে গঠিত নতুন ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ও বিশাল। একই এলাকায় একাধিক শাখা থাকলে সেগুলো পুনর্বিন্যাস করতে হবে। কিন্তু এর সঙ্গে কর্মী ব্যবস্থাপনা ও সাংগঠনিক সংস্কারের মতো সংবেদনশীল বিষয় জড়িত।
৭. মূলধনের পর্যাপ্ততা
সরকার ও আমানতকারীদের অংশগ্রহণে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিপুল খেলাপি ঋণের তুলনায় এই মূলধন যথেষ্ট হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। প্রয়োজনে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত মূলধন সহায়তার প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।
উপসংহার
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটি সাহসী পুনর্গঠন উদ্যোগ। তবে এটি কেবল একটি ব্যাংক একীভূতকরণ নয়; বরং দেশের আর্থিক খাতের সংস্কার সক্ষমতারও পরীক্ষা। খেলাপি ঋণ আদায়, আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, প্রযুক্তিগত সমন্বয় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সফল হলে এটি ভবিষ্যতে দুর্বল ব্যাংক পুনরুদ্ধারের একটি কার্যকর মডেল হয়ে উঠতে পারে। ব্যর্থ হলে এর প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর পড়বে। তাই আগামী কয়েক বছর হবে এই উদ্যোগের প্রকৃত পরীক্ষার সময়।
Comments