সীমান্তে পুশ-ইনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন সমীকরণ
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিবেশী ভারতের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ভৌগোলিক অবস্থান,অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা, অভিন্ন নদী, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে দুই দেশের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে বিএসএফের 'পুশইন' তৎপরতা, অভিন্ন বিভিন্ন ইস্যুতে অমীমাংসিত বিরোধ এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাসের কারণে এই সম্পর্ক আবারও নতুন এক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে।
এমন এক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে চীন সফরকে অনেকেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন। প্রশ্ন হচ্ছে,এটি কি কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ,নাকি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় একটি কৌশলগত পদক্ষেপ?
বাস্তবতা হলো,বাংলাদেশের জন্য ভারত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি চীনও এখন একটি বড় অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগী। অবকাঠামো উন্নয়ন,শিল্পায়ন,বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ খাতে গত এক দশকে চীনের বিনিয়োগ ও আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিস্তা প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি বড় উদ্যোগে চীনের আগ্রহ বহুদিনের। ফলে নতুন সরকার যদি চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের চেষ্টা করে,সেটিকে অস্বাভাবিক বলার সুযোগ নেই।
তবে এই সফরের সময়টিই সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে সাম্প্রতিক অস্বস্তির মধ্যেই চীন সফর বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বার্তা বহন করতে পারে। সেই বার্তা হলো-বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। বরং বহুমাত্রিক সম্পর্কের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে চায়।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি কিছুটা অস্বস্তিকর হতে পারে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিকে দিল্লি দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে আসছে। শ্রীলঙ্কা,নেপাল,মালদ্বীপ কিংবা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে চীনের প্রভাব বৃদ্ধির অভিজ্ঞতা ভারতের নীতিনির্ধারকদের উদ্বিগ্ন করে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা স্বাভাবিকভাবেই ভারতের নজরে থাকবে।
তবে এটাও সত্য যে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে কেবল চীন-ফ্যাক্টরের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যাবে না। দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি অনেক গভীর এবং বহুমাত্রিক। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য, বিদ্যুৎ সহযোগিতা,আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা সমন্বয় দুই দেশকে পরস্পরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করেছে। ফলে কোনো পক্ষেরই সম্পর্ককে সংঘাতের দিকে নিয়ে যাওয়ার বাস্তবিক সুযোগ খুব বেশি নেই।
বরং বর্তমান পরিস্থিতি ভারতকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে একটি অভিযোগ প্রচলিত যে,দিল্লি প্রায়ই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সমতার ভিত্তিতে নয়,বরং প্রভাব বিস্তারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখে। সীমান্ত হত্যা,তিস্তার পানি বণ্টন,বাণিজ্য বৈষম্য কিংবা সাম্প্রতিক পুশইন ইস্যু সেই অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে। যদি বাংলাদেশ বিকল্প অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করে,তবে ভারতও হয়তো উপলব্ধি করবে যে আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে প্রতিবেশীদের প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্যও সতর্কতার জায়গা রয়েছে। ভারতবিরোধী আবেগকে কূটনৈতিক কৌশলের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। ভৌগোলিক বাস্তবতা বলে,ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের জন্য অপরিহার্য। একইভাবে চীনের সঙ্গে সম্পর্কও হতে হবে স্বচ্ছতা,অর্থনৈতিক লাভ এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। কোনো বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার মাঠে বাংলাদেশ যেন পরিণত না হয়,সেটিই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের প্রধান লক্ষ্য।
পুশইন ইস্যুতেও প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ও মানবিক সমাধান। প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত। সীমান্তে এনে জোর করে ঠেলে দেওয়া বর্বরতা। যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে বিরোধ রয়েছে,তাদের বিষয়ে যৌথ যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সীমান্তকে রাজনৈতিক বার্তা আদান প্রদানের ক্ষেত্র বানালে সমস্যার সমাধান হবে না বরং অবিশ্বাস আরও বাড়বে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে তাৎক্ষণিকভাবে 'চীনমুখী নীতি' হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। বরং এটি বাংলাদেশের বহুমুখী কূটনীতির অংশ বলেই বেশি মনে হয়। তবে এই সফরের প্রকৃত তাৎপর্য নির্ভর করবে কী ধরনের চুক্তি ও সমঝোতা হয় এবং সেগুলো কতটা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে শক্তিশালী করে তার ওপর।
ভারত যদি এটিকে প্রতিযোগিতার চোখে না দেখে,বরং বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্বেগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও সম্মানজনক ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে পারে, তাহলে উভয় দেশের জন্যই তা ইতিবাচক হবে। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের স্বার্থেও সেটিই সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পথ।
Comments