কর্মসংস্থান ও জিডিপি বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের মেগা পরিকল্পনা
দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান ১.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং দ্রুত ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশব্যাপী 'ক্রিয়েটিভ হাব' বা সৃজনশীল কেন্দ্র গড়ে তোলার মেগা পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে 'ওয়ান-ভিলেজ, ওয়ান-প্রোডাক্ট' বা 'এক গ্রাম, এক পণ্য' উদ্যোগের আওতায় অঞ্চলভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রসারের রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই নতুন ও সম্ভাবনাময় খাতের উন্নয়নে প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাত থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা যুক্ত করে মোট ৮০০ কোটি টাকার তহবিল গঠনের আশা করছে সরকার।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, "আমাদের লক্ষ্য দেশের সৃজনশীল শিল্পখাতের বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করা এবং সেগুলোকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা।"
এই বিশেষ উদ্যোগের আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ও বৈচিত্র্যময় সৃজনশীল পণ্যগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর বিশ্ববাজার ধরা হবে। এই তালিকায় রয়েছে: তাঁত ও বয়ন শিল্প, মৃৎশিল্প এবং টেরাকোটা (পোড়ামাটির ফলক),ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি, শতরঞ্জি, কাঠের পুতুল এবং হাতে তৈরি গহনাসহ অন্যান্য আঞ্চলিক কারুশিল্প।
পণ্যের মান উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক বাজারের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকার একটি 'ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনার্স' গঠন করবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) ডিজাইন সেন্টারকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আধুনিকায়ন করা হবে।
বাজেটে চিহ্নিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশজুড়ে স্থাপিত 'ক্রিয়েটিভ হাব'গুলো একাধারে সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। এসব হাবে থাকবে:
- আধুনিক সাংস্কৃতিক ভেন্যু ও সিনেপ্লেক্স।
- পাঠ সুবিধাসহ বইয়ের দোকান এবং ক্যাফেটেরিয়া।
- 'এক গ্রাম, এক পণ্য' কর্মসূচির আঞ্চলিক পণ্যগুলোর স্থায়ী প্রদর্শনী, প্রচার ও বিপণন কেন্দ্র।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটি ১০ বছর মেয়াদি বিনিয়োগ কৌশল এবং সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে, যার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কয়েকটি সম্ভাব্য স্থানে উপযোগিতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে।
রাজধানী ও এর বাইরে এই নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দিতে জমি চিহ্নিতকরণের কাজ চলছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (PPP) ভিত্তিতে পূর্বাচলে ১৬০ একর জমির ওপর একটি বিশ্বমানের 'সেন্ট্রাল ক্রিয়েটিভ হাব' স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কারওয়ান বাজার, তেজগাঁওয়ে সার্ভেয়ার জেনারেলের কার্যালয় সংলগ্ন অব্যবহৃত জমি এবং বিসিকের আওতাধীন খালি শিল্প প্লটগুলোতে হাব স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই হাব সম্প্রসারণ করা হবে। এমনকি বাংলাদেশ শিশু একাডেমি এবং শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণেও একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা হবে।
পাশাপাশি, দেশের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলমান 'ইনোভেশন হাব' (উদ্ভাবন কেন্দ্র) কর্মসূচিকে দেশের অন্য সব বিশ্ববিদ্যালয় ও স্নাতক পর্যায়ের কলেজগুলোতে ছড়িয়ে দিতে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে।
সমাজের সব স্তরে অর্থনৈতিক সুযোগের গণতান্ত্রিকীকরণ করতে চায় সরকার। অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপকল্পের কথা উল্লেখ করে বলেন, "বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের (১ লক্ষ কোটি ডলার) অর্থনীতিতে রূপান্তর করার লক্ষ্য আমাদের।"
সরকার আশা করছে, ক্রিয়েটিভ হাব ও ডিজাইন সহায়তার এই সমন্বিত ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে দেশের জনমিতিক লভ্যাংশকে সফলভাবে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে।
Comments