বাজারে দুই ইসলামী ব্যাংক: প্রতিযোগিতা, আস্থা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং খাতে নতুন বাস্তবতার উদ্ভব। একদিকে দীর্ঘদিনের পরিচিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, অন্যদিকে পাঁচটি দুর্বল ও সংকটাপন্ন ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। নামের মিল, কার্যক্রমের মিল এবং একই ধরনের গ্রাহকভিত্তি-সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, একই বাজারে দুটি বৃহৎ ইসলামী ব্যাংক কতটা সফল হতে পারবে?
প্রশ্নটি শুধু ব্যবসায়িক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনগণের আস্থা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।
সংকটের পটভূমি
গত এক দশকে দেশের কয়েকটি ইসলামী ধারার ব্যাংক রাজনৈতিক প্রভাব,দুর্বল সুশাসন এবং ব্যাপক ঋণ অনিয়মের কারণে গভীর সংকটে পড়ে। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপকে কেন্দ্র করে যে অভিযোগগুলো সামনে আসে,তা শুধু কয়েকটি ব্যাংক নয়,পুরো ইসলামী ব্যাংকিং খাতের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।
এই বাস্তবতায় এক্সিম ব্যাংক,গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক,ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক,সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দুর্বল সম্পদ ও দায়কে এক প্ল্যাটফর্মে এনে পুনর্গঠন করা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
কিন্তু একীভূতকরণ কাগজে-কলমে সহজ হলেও বাস্তবে তা অত্যন্ত কঠিন। ৭৬ লাখ গ্রাহকের আমানত,বিভিন্ন ব্যাংকের ভিন্ন ভিন্ন আর্থিক অবস্থা,প্রযুক্তিগত সমন্বয়,খেলাপি ঋণের পাহাড়-সব মিলিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানটির সামনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ফলে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের পরও গ্রাহকদের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
ইসলামী ব্যাংকের নতুন পরীক্ষা
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশও এখন এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
একসময় দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ইসলামী ব্যাংক হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানও সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদকে ঘিরে বিতর্কের কারণে বড় ধরনের আস্থার সংকটে পড়ে। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ,আমানতকারীদের উদ্বেগ এবং ব্যাপক অর্থ উত্তোলনের চাপ ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতিকে নড়বড়ে করে দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ,বিশেষ তারল্য সহায়তা এবং প্রশাসক নিয়োগ পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা করেছে। কিন্তু এ ঘটনাও দেখিয়ে দিয়েছে যে ব্যাংকিং খাতে মূল সম্পদ হলো অর্থ নয়, আস্থা। আস্থা ভেঙে গেলে হাজার হাজার কোটি টাকার সহায়তাও কেবল সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে।
একই নামে দুই ব্যাংক: সমস্যা নাকি সম্ভাবনা?
'ইসলামী ব্যাংক' নামটি বাংলাদেশে শুধু একটি ব্যাংকের নাম নয়; এটি একটি ব্র্যান্ড, একটি ধারণা এবং কোটি মানুষের আর্থিক বিশ্বাসের প্রতীক।
এখন যখন একটি প্রতিষ্ঠান "ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ" এবং অন্যটি "সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক" নামে কার্যক্রম পরিচালনা করবে,তখন সাধারণ গ্রাহকের মধ্যে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে গ্রামীণ ও কম শিক্ষিত গ্রাহকদের জন্য দুটি প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য বোঝা সবসময় সহজ হবে না।
তবে নামের মিল থাকলেই যে উভয় ব্যাংক ব্যর্থ হবে, এমন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই ধরনের ইসলামী ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারী একাধিক প্রতিষ্ঠান সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সফলতার মূল শর্ত নাম নয়, বরং সুশাসন,স্বচ্ছতা,প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও গ্রাহকসেবা।
যদি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ তার দীর্ঘদিনের ব্র্যান্ড মূল্য ধরে রাখতে পারে এবং সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে, তাহলে দুটি ব্যাংকই বাজারে টিকে থাকার সুযোগ পাবে।
মূল লড়াই হবে আস্থার
বাস্তবে এই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে আমানতের জন্য নয়,আস্থার জন্য। একজন গ্রাহক ব্যাংকে টাকা রাখেন মুনাফার হার দেখে,কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের সঙ্গে থাকেন বিশ্বাসের কারণে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে এখানেই। মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করেছে-শুধু ইসলামী নাম থাকলেই কি একটি ব্যাংক সত্যিকার অর্থে নিরাপদ? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে দুই ব্যাংককেই।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে প্রমাণ করতে হবে যে এটি কেবল পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের সমষ্টি নয়; বরং একটি নতুন,কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে দেখাতে হবে যে প্রশাসনিক পরিবর্তন ও সাময়িক তারল্য সংকট কাটিয়ে তারা আবারও স্থিতিশীল ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাই হবে নির্ধারক
এই দুই ব্যাংকের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ও নীতিগত দৃঢ়তার ওপর। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যাংকিং খাতকে বড় ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। ফলে শুধু নতুন চেয়ারম্যান,নতুন এমডি বা নতুন বোর্ড দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি,খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার,স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ এবং দায়বদ্ধ ব্যবস্থাপনা।
বাংলাদেশ ব্যাংক যদি কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখতে পারে,তাহলে দুই ব্যাংকই পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাবে। অন্যথায় নতুন সংকটের ঝুঁকি থেকেই যাবে।
একই নামে বা একই ধারার দুটি ব্যাংক সফল হবে কি না,তার উত্তর আজই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত-সফলতার চাবিকাঠি নামের মধ্যে নয়,পরিচালনার মধ্যে। বাংলাদেশের মানুষ ইসলামী ব্যাংকিং চায়,কিন্তু তার চেয়েও বেশি চায় নিরাপদ ব্যাংকিং। তারা শরিয়াহভিত্তিক সেবা চায়,কিন্তু তার সঙ্গে চায় জবাবদিহি,স্বচ্ছতা এবং নিজের আমানতের নিশ্চয়তা।
অতএব,আগামী দিনের প্রতিযোগিতা হবে 'কে বেশি ইসলামী'-সেটি নিয়ে নয়; বরং 'কে বেশি বিশ্বাসযোগ্য'-সেটি নিয়ে। আর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেই একই বাজারে দুটি ইসলামী ব্যাংকের সফল সহাবস্থান সম্ভব হবে।
Comments