বেতন বাড়লেই কি দুর্নীতি কমে?
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে বা কমার কথা। তাঁর যুক্তি হলো, অভাব মানুষের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা সৃষ্টি করে। কথাটি শুনতে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং অর্থনৈতিক গবেষণা বলছে, দুর্নীতির সঙ্গে বেতনের সম্পর্ক থাকলেও সেটি একমাত্র বা প্রধান কারণ নয়। বরং জবাবদিহি, শাস্তির নিশ্চয়তা, প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বশেষ বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি হয়েছিল ২০১৫ সালে, যখন অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর করা হয়। সে সময় মূল বেতন গড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল। সরকারি চাকরি তখন আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই বেতন বৃদ্ধি কি দুর্নীতি কমাতে পেরেছিল? বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। ওই সময়েই ব্যাংক খাতের নানা অনিয়ম, সরকারি প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। অর্থাৎ বেতন বাড়লেও দুর্নীতির অভিযোগ কমেনি।
এর কারণ দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক অভাবের ফল নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতি লোভ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি থেকে জন্ম নেয়। একজন কর্মকর্তা যদি জানেন যে দুর্নীতি করেও ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম, অথবা ধরা পড়লেও বড় কোনো শাস্তি হবে না, তাহলে উচ্চ বেতনও তাঁকে দুর্নীতি থেকে বিরত রাখতে পারে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে উচ্চ বেতনপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারাও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হয়েছেন।
অন্যদিকে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা এবং কার্যকর বিচারব্যবস্থা থাকলে তুলনামূলক কম বেতনেও প্রশাসন সৎভাবে পরিচালিত হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে অনেকেই সিঙ্গাপুর-এর কথা বলেন। সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন তুলনামূলকভাবে উচ্চ হলেও দুর্নীতি কমার মূল কারণ শুধু বেতন নয়; বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, স্বাধীন তদন্ত সংস্থা এবং দ্রুত বিচার ব্যবস্থা। অর্থাৎ বেতন একটি সহায়ক উপাদান, কিন্তু একক সমাধান নয়।
এখন সরকার নবম পে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। এতে প্রথম ধাপেই কয়েক দশ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। দেশের প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য এ ব্যয় বহন করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিনিময়ে রাষ্ট্র কী পাচ্ছে?
সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় গত ১৫ বছরে বরাদ্দ প্রায় চার গুণ বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে সরকারি সেবার মান কি সমান হারে উন্নত হয়েছে? সাধারণ নাগরিকের অভিজ্ঞতা তা বলে না। ভূমি অফিস, কর অফিস, বিভিন্ন অনুমোদন প্রক্রিয়া কিংবা সেবা প্রদানকারী দপ্তরগুলোতে ভোগান্তি এবং অনিয়মের অভিযোগ এখনও ব্যাপক। অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল সেবা চালু হলেও দুর্নীতির নতুন নতুন পদ্ধতি তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ ব্যয় বাড়লেও দক্ষতা ও জবাবদিহির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।
সরকারি বেতন বাড়ানোর বিরোধিতা করার কোনো কারণ নেই। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মীদের ন্যায্য জীবনমান নিশ্চিত করার জন্য বেতন সমন্বয় প্রয়োজন। একজন সরকারি কর্মচারীকে এমন বেতন দেওয়া উচিত, যাতে তিনি সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারেন। কিন্তু সেই বেতন বৃদ্ধিকে দুর্নীতি কমানোর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
বরং বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে কয়েকটি শর্ত যুক্ত করা প্রয়োজন। প্রথমত, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সম্পদের হিসাব ও জীবনযাত্রার মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তৃতীয়ত, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, সরকারি সেবার মান ও জনসন্তুষ্টিকে কর্মজীবনের মূল্যায়নের অংশ করতে হবে। কেবল বেতন বাড়িয়ে নয়, জবাবদিহি বাড়িয়েই প্রশাসনের গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব।
রাষ্ট্রের অর্থ সীমাহীন নয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ইতোমধ্যে বাজেটের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যয়ের খাতে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রতি দফা বেতন বৃদ্ধি মানে শুধু বর্তমান বছরের অতিরিক্ত ব্যয় নয়, ভবিষ্যতের জন্যও স্থায়ী আর্থিক দায়। তাই জনগণের করের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ফলাফলও নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, বেতন বৃদ্ধি দুর্নীতি কমানোর একটি সহায়ক উপাদান হতে পারে, কিন্তু তা কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। গত এক দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বেতন বাড়লেও দুর্নীতি নিজে থেকে কমে না। দুর্নীতি কমে তখনই, যখন সৎ থাকার প্রণোদনার পাশাপাশি অসৎ হওয়ার মূল্যও অনেক বেশি হয়ে যায়। তাই প্রয়োজন শুধু বড় বেতন নয়; প্রয়োজন বড় জবাবদিহি, কার্যকর শাস্তি এবং সুশাসনের সংস্কৃতি। তখনই হয়তো জনগণ অনুভব করবে যে রাষ্ট্রের বাড়তি ব্যয় সত্যিই দেশের জন্য সুফল বয়ে আনছে।
Comments