ইসলামী ব্যাংক: আর্থিক প্রতিষ্ঠান নাকি রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র?
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে জামায়াতে ইসলামী এত মরিয়া কেন? এই প্রশ্ন উঠছে,কারণ দলটির নেতারা এই ব্যাংক নিয়ে এমন সব মন্তব্য করছেন বা হুমকি দিচ্ছেন যা দেখলে মনে হয় ব্যাংকটি এই দলেরই। দেশে হামে এত এত শিশুর মৃত্যু,আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যূ নিয়ে দলের নেতাদের তেমন কোন বক্তব্য চোখে পড়েনি,যেমন পড়েনি পাঁচ শরীয়া ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের দু:খ কষ্ট নিয়েও।
সরকারের অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক খাতের দেখভালের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। তারাই ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশিদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। নিয়োগের সাথে সাথেই আন্দোলনে নামে জামায়াতের নেতা কর্মীরা।
ইসলামী ব্যাংকের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে গত ১ জুন থেকে মতিঝিলে আন্দোলন করছে সচেতন গ্রাহক ফোরাম নামের কিছু মানুষ। এবং তখন থেকে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে জামায়াত নেতারাও নানা বক্তব্য দিচ্ছেন। প্রশ্ন উঠেছে,ব্যাংকটি কি জামায়াতের? দলটির একজন শীর্ষ নেতারা সরাসরি এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলেন - তাদের 'লোকেরা' এই ব্যাংকে কাজ করে,লেনদেন করে।
গত ৩ জুন, ঢাকায় আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন,ইসলামী ব্যাংক 'দখলের পাঁয়তারা' হলে নিজেই রাস্তায় নামবেন। তিনিও এই ব্যাংকের মালিক বলে উল্লেখ করেন। জামায়াতের অন্যান্য স্তরের নেতারাও বিভিন্ন স্থানে এরকম হুশিয়ারী দিচ্ছেন।
বেসরকারি খাতে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটি এক সময় ছিল জামায়াত নেতাদের নিয়ন্ত্রণে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৭ সালে ব্যাংকটি 'নিয়ন্ত্রণে' নেয় বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটি 'এস আলম মুক্ত' হয় এবং জামায়াতপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর নীলফামারীর সৈয়দপুরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে এক পথসভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ব্যাংকটি নিয়ে বলেছিলেন,"ব্যাংকটি তার মায়ের কোলে ফিরে এসেছে।"
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। বিএনপি সরকার গত ২৪ মে খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়। এর আগে ব্যাংকটির সে সময়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুক খানকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়।
গ্রাহকদের নাম করে জামায়াতে ইসলামির নেতা কর্মীরাই মাঠ দখলে নেমেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদেও বাহাস হয়েছে এই ব্যাংক নিয়ে। বলা হয় – জামায়াতে ইসলামীর অর্থায়ন হয় এই ব্যাংকের মাধ্যমে। আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংকে কী কী অনিয়ম হয়েছে,তার তালিকা তুলে ধরেন। তিনি বলেন,আরডিএস ইসলামী ব্যাংকের একটা ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প আছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। আগে ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়ার জন্য আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে নাবিল গ্রুপকে ৭০০ কোটি টাকা এলসির বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়েছে এবং পরে মালামাল বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন,দুষ্টু লোকেরা বলে,সেটা কোনো এক দলের নির্বাচনী তহবিলে গেছে। অর্থাৎ জামায়াতের দিকেই তারঁর ইঙ্গিত।
আরও আরও অনিয়মের খতিয়ান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন,তকবির দিয়ে ব্যাংক দখল করার পর যাঁদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে তাঁদের সংখ্যা হচ্ছে ৯ হাজার। কোনো আইন-কানুন না দেখিয়ে তাঁদের নিয়মবহির্ভূতভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। জামায়াতে দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন,ছয় হাজার নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সবাই একটি রাজনৈতিক মতাবলম্বী।
এদিকে,পরিকল্পিতভাবে ব্যাংকটি থেকে টাকা উঠিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ আসছে। নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশিদ আলমের নিয়োগ ঘিরে চলমান অস্থিরতার মধ্যে গত পাঁচ কার্যদিবসে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি থেকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন গ্রাহকরা। ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের মতে,চেয়ারম্যান নিয়োগ কেন্দ্র করে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার কারণে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান,১ থেকে ৪ জুন পর্যন্ত চার কার্যদিবসে প্রায় ২ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়। এছাড়া ৭ জুন একদিনেই প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন হয়েছে বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
এভাবে চললে,সমস্যায় পড়বে দেশের সবচয়ে বড় ব্যাংক। এমন এক আশংকার মধ্যেই খবর বেরিয়েছে যে,আবারও টাকার সংকটে পড়েছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক। চেয়ারম্যান নিয়োগের পর নানা বিতর্ক ও চলমান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটি থেকে গ্রাহকেরা গত এক সপ্তাহে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি তুলে নিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকের চাহিদা সামাল দিতে মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা ধার চেয়েছে ব্যাংকটি।
ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব দেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর সেটা সবাই দেখেছে আওয়ামী লীগের ১৫ বছর। সংবেদনশীল মানুষ মাত্রই আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে দেখতে চায়। কারণ বড় কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো ও পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক তৈরি হলে তা সরাসরি আস্থা ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলে। ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আস্থা ও স্বচ্ছতা। অতীত বা বর্তমান-যে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব দীর্ঘায়িত হলে তা আমানতকারীদের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে যা প্রকারান্তরে দেশের অর্থনীতিকে বিপদে ফেলে।
Comments