৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে ২ লাখ কোটি টাকার সংকট সামলানোর কৌশল!
অবশেষে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পেল সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ দুটি ভিন্ন চিঠিতে এই দুটি পদে নিয়োগ দিয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পরিপত্রে বলা হয়েছে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও চেয়ারম্যান পদে কাজী শায়রুল হাসানকে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক/সিইও পদে আবেদুর রহমান সিকদারকে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁদের যোগ দেওয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি লাগবে।
শরিয়াহভিত্তিক এক্সিম, সোশ্যাল ,ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী,গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক মিলে এই ব্যাংক গঠিত হয়েছে। এই ব্যাংক ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের জমানো টাকার বিপরীতে শেয়ার দেওয়া হয়। গত বছরের ৩০ নভেম্বর এই ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়।
মূলত: অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো থেকে বের করা বেশিরভাগ অর্থ পাচারের কারণেই ভঙ্গুর হয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানগুলো। দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকরা পথে পথে ঘুরছেন তাদের টাকা তোলার জন্য। কোন কোন জায়গায় হতাশা থেকে তারা মারমুখীও হয়ে উঠেছিলেন কাঙ্ক্ষিত টাকা না পেয়ে।
সরকার বলছে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে এ পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা ও ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিধিবিধান মেনেই এটি করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের ব্যাংক খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। আহসান মনসুরের সক্রিয়তায় এই ব্যাংক একীভুতকরণ সম্পন্ন হয়।
তবে হেয়ার কাট পদ্ধতির নামে গ্রাহকদের অর্জিত মুনাফা কেটে নেওয়া,ক্ষুদ্র বিনীয়োগকারীদের বিনিয়োগ শূন্য ঘোষণা করা,লুটেরাদের দায় রাষ্ট্রের ওপর চাপানো এবং এক্সিম ব্যাংক-কে এই একীভূতকরণের মধ্যে রাখা নিয়ে আহসান মনসুরের অনেক সমালোচনা আছে।
এটি হতে চলেছে রাষ্ট্রায়ত্ব খাতে সবচেয়ে বড় ব্যাংক, একমাত্র রাষ্ট্রীয় ইসলামী ব্যাংক। সরকারি ব্যাংক হিসেবে এটি টিকে থাকবে বলেই সবার ধারণা। তবে সফল কতটুকু হবে সে নিয়ে প্রশ্ন আছে। ব্যাংক টিকে থাকে আমানতকারীদের আস্থার ওপরে। প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা আমানতকারীদের পাওনা। প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা মন্দ ঋণ। এর বিপরীতে মাত্র ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে ব্যাংকটি।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে একীভূত কোনো কোনো ব্যাংকের মূলধন প্রায় ৪০০ শতাংশ ঋণাত্মক। একীভূত এসব ব্যাংকের সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা কিছুই পাচ্ছেন না এবং তাদের শেয়ারমূল্য শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।
সরকার প্রত্যাশা করছে,দুই বছরে ব্যাংকটি দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু অনেকেরই ধারণা দুই বছরে দাঁড়ানো খুবই কঠিন। আগে গ্রাহকদের আস্থা আনতে হবে। নতুন ডিপোজিট তখনই আসবে,যখন পুরনো গ্রাহকরা তাদের টাকা ঠিক মতো পাবে। কিন্তু সেটা না হলে তো নতুন ডিপোজিট আসবে না। আরেকটা জিনিস এখানে গুরুত্বপূর্ণ,সেটা হচ্ছে ব্যাংকের কর্মীদের কী হবে?
প্রতি মাসে পাঁচ ব্যাংকের কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ পরিচালন খাতে ব্যয় হয় অন্তত ৩৫০ কোটি টাকা। কিন্তু এ পরিমাণ অর্থ ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ও অন্যান্য খাত থেকে আয় হচ্ছে না। এতে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর আগেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ওপর বিপুল লোকসানের ভার এসে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে সরকারের জোগান দেয়া মূলধনের কী দশা হবে তা নিয়ে শংকা আছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যাবসায়িক মডেল বা ধারণা সাধারণের কাছে একেবারেই অস্পষ্ট। প্রায় ২ লাখ হাজার কোটি টাকা আদায়ের নির্দিষ্ট পথরেখা বা রোডম্যাপ নেই। ওইসব ঋণগ্রহীতার সঙ্গে কখন কোন প্রক্রিয়ায় আলোচনা হবে, কতটুকু আদায়যোগ্য সে সম্পর্কে নীতিমালা অনুপস্থিত। আমানতকারীরা তাদের ধৈর্যের চূড়ান্ত সীমায় রয়েছেন। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ঋণদানযোগ্য বিনিয়োগ তহবিল কোথায়? নতুন বিনিয়োগ না হলে এ ব্যাংক কোথা থেকে তহবিলের ব্যবস্থা করবে?
বিনিয়োগ-বহির্ভূত আয়ে বিরাজমান প্রতিযোগিতায় তারা টিকতে পারবে কি? সরকার এসব ব্যাংকে বিনিয়োগ-বহির্ভূত আয়ে বিশেষ সুবিধা দিলে অন্যান্য ব্যাংক নাখোশ হবে এবং তাদের ব্যাবসা ঝুঁকির মুখে পড়বে। প্রচলিত খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এ ব্যাংক লাভের মুখ কীভাবে দেখবে? সরকারি কোষাগার থেকে সরবরাহকৃত মূলধন তহবিল বর্তমান আমানতকারীদের দায় মিটিয়ে নতুন বিনিয়োগের জন্য কিছুই থাকবে না। সেক্ষেত্রে শেষ ভরসা হবে নতুন আমানত সংগ্রহ করা। সফল হতে হলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে নতুন ও পুরনো আমানতকারীদের আস্থা অর্জন করে আমানত সংগ্রহ এবং তার উত্তম বিনিয়োগই একমাত্র পথ। কাজটি বেশ কঠিন।
Comments