টাকা গেল লুটেরাদের পকেটে, পথে পথে আমানতকারীরা!
ঈদের আগে একীভূত হতে যাওয়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক এবং পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের হাতে কিছু অর্থ তুলে দেওয়ার কথা বলেছিলাম। আমরা জানি না সেটা হয়েছে কিনা। হলে ভালো হতো, কারণ ওই অর্থ সরকারের নয়, ব্যাংকেরও নয়—সেটি আমানতকারীদের নিজস্ব সঞ্চয়। তবে এই উদ্যোগ কেবল সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে; দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা তাদের পুরো অর্থ কীভাবে ফেরত পাবেন? সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এটিই। এর সন্তোষজনক সমাধান না হলে ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা আরও গভীর হবে।
বর্তমানে সংকটে থাকা ইসলামী ধারার কয়েকটি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। আর বন্ধ বা অবসায়নের তালিকায় থাকা পাঁচটি এনবিএফআই হলো—ফাস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। বছরের পর বছর এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ গেছে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে। সেই ঋণের বড় অংশ এখন খেলাপি আর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রয়েছে অর্থপাচার, জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ। আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো বড় ঋণখেলাপিদের সম্পদ দ্রুত বাজেয়াপ্ত করে বিক্রি করা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। ফলে ব্যাংকের অর্থ আটকে থাকে, আর আমানতকারীরা নিজেদের সঞ্চয় ফেরত পাওয়ার জন্য অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান। এ কারণে বড় ঋণ কেলেঙ্কারি ও ব্যাংক জালিয়াতি সংক্রান্ত মামলাগুলোর জন্য পৃথক আদালত গঠন জরুরি। নির্দিষ্ট বিচারক নিয়োগ এবং সময়সীমাবদ্ধ বিচারপ্রক্রিয়া ছাড়া দ্রুত অর্থ উদ্ধার সম্ভব নয়। প্রচলিত আদালত ব্যবস্থায় হাজার হাজার মামলার ভিড়ে ব্যাংক খাতের এই সংকটের কার্যকর সমাধান পাওয়া কঠিন।
এস আলমের ঋণসাম্রাজ্য, অর্থ উদ্ধারের প্রশ্ন
সংকটে থাকা পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছাড়া বাকি চারটির নিয়ন্ত্রণ ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলমের হাতে। শুধু এই চারটি ব্যাংক নয়, দেশের বৃহত্তম ইসলামী ব্যাংক থেকেও বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এস আলম গ্রুপ নামে-বেনামে প্রায় সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা ঋণের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে সরিয়ে নিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপুল অর্থের বিপরীতে তাদের কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে? এবং সেই সম্পদ বিক্রি করে কতটা অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব? এস আলম গ্রুপের শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আবাসন প্রকল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র, জমি, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ এবং অন্যান্য সম্পদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জনসমক্ষে স্পষ্ট তথ্য নেই। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত অবরুদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত সম্পদের একটি হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করা। এতে জনগণ জানতে পারবে, লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারে বাস্তবে কতদূর অগ্রগতি হয়েছে।
পিকে হালদার, নজরুল ইসলাম মজুমদার ও সিকদার পরিবার
একইভাবে লিজিং কোম্পানি লুটকারী পি কে হালদার, সাবেক ব্যাংক উদ্যোক্তা নজরুল ইসলাম মজুমদার, সিকদার গ্রুপসহ অন্যান্য প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। কেবল মামলা দায়ের করাই যথেষ্ট নয়; সম্পদের মূল্যায়ন, তালিকাভুক্তি, সংরক্ষণ ও বিক্রির জন্য একটি কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স গঠন সময়ের দাবি।
সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী আমানতকারীরা
এই সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো সাধারণ আমানতকারীদের দুর্ভোগ। নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ তুলতে গিয়ে তারা যেন ব্যাংকের গ্রাহক নয়, বরং করুণার পাত্রে পরিণত হয়েছেন। ব্যবসা পরিচালনা, চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের শিক্ষা কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ মেটাতে গিয়ে অসংখ্য পরিবার বিপাকে পড়েছে। ব্যাংকের শাখাগুলোতে প্রতিদিন দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ অপেক্ষা, সীমিত উত্তোলন এবং অনিশ্চয়তা। অবসরপ্রাপ্ত মানুষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
এ অবস্থায় বড় ঋণখেলাপিদের সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, বাজেয়াপ্ত সম্পদের বাজারমূল্য নির্ধারণ এবং দ্রুত অর্থ উদ্ধারের জন্য বিশেষ আদালত গঠন অপরিহার্য। জনগণের সামনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন সম্ভব হবে না। ব্যাংক একীভূতকরণ কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন হয়তো প্রশাসনিক সংকট সামাল দেওয়ার একটি উপায়। কিন্তু সেটি কখনোই মূল সমাধান নয়। প্রকৃত সমাধান হলো লুট হওয়া অর্থ উদ্ধার, দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং আমানতকারীদের ন্যায্য অর্থ দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন, শেয়ারমূল্য বা ব্যালান্সশিট নয়; সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস একবার হারিয়ে গেলে তা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে কঠিন কাজ।
Comments