উৎসব শুধু কোরবানিতে নয়, সহমর্মিতায়
ঈদ মোবারক। আজ পবিত্র ঈদ উল আযহা।
কোরবানির ঈদ এলেই বদলে যায় চারপাশের চেনা দৃশ্য। শহরের ব্যস্ত সড়কে দেখা যায় গরুবাহী ট্রাকের দীর্ঘ সারি, অলিগলিতে জমে ওঠে অস্থায়ী পশুর হাট, শিশুদের চোখে মুখে উচ্ছ্বাস, আর ঘরে ঘরে শুরু হয় ঈদের প্রস্তুতি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের মুখে একটাই আলোচনা-কোরবানি, ঈদ আর মিলনের আনন্দ। বছরের অন্য সময়ের চেয়ে এই কয়েকটি দিনে যেন পুরো সমাজ এক ভিন্ন আবহে ঢুকে পড়ে। ঈদ উল আজহা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি একসঙ্গে আনন্দ, ত্যাগ, মানবতা ও আত্মিক শিক্ষার এক অনন্য আয়োজন।
মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব এই ঈদুল আজহা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ এক শিক্ষা বহন করে। ইসলামের পাঁচটি অবশ্যপালনীয় বিধানের মধ্যে হজ অন্যতম। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মুসলমান পবিত্র মক্কায় সমবেত হন হজ পালনের জন্য। আর হজের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো কোরবানি। বাংলাদেশ থেকেও প্রতিবছর হাজারো মানুষ হজে যান। পবিত্র আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে তাঁরা আল্লাহর দরবারে ক্ষমা ও শান্তি কামনা করেন। সেই আবহ ছড়িয়ে পড়ে পুরো মুসলিম বিশ্বে।
ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা ত্যাগের শিক্ষা। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জীবনের সেই ঐতিহাসিক ঘটনা আজও মুসলমানদের হৃদয়ে গভীরভাবে নাড়া দেয়। আল্লাহ তাআলা যখন তাঁকে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কোরবানি করার নির্দেশ দিলেন, তখন তিনি বিনা দ্বিধায় তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে প্রস্তুত হন। পিতার প্রতি সন্তানের আনুগত্য এবং আল্লাহর প্রতি তাঁদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ মানব ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পরে আল্লাহ তাআলা ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানির ব্যবস্থা করেন। সেই ঘটনার স্মরণেই মুসলমানরা প্রতিবছর পশু কোরবানি করেন।
তবে কোরবানির প্রকৃত অর্থ কেবল পশু জবাইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এর ভেতরে আছে আত্মত্যাগের গভীর শিক্ষা। মানুষ তার ভেতরের অহংকার, লোভ, হিংসা, স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা ত্যাগ করার অঙ্গীকার করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই এই শিক্ষার জায়গাটি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। এখন অনেকের কাছে ঈদের আনন্দ মানে বড় গরু কেনা, দামি পশু নিয়ে সামাজিক মর্যাদা দেখানো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশের প্রতিযোগিতা। কে কত বড় পশু কিনেছেন, কার কোরবানির আয়োজন বেশি জমকালো-এসব বিষয় যেন উৎসবের আলোচনায় বেশি জায়গা দখল করে নিচ্ছে।
অথচ ঈদ উল আজহার প্রকৃত আনন্দ অন্য জায়গায়। এই আনন্দ লুকিয়ে আছে ভাগাভাগির মধ্যে। যে মানুষটি সারা বছর ভালোভাবে খাবার জোটাতে পারেন না, তাঁর ঘরে যখন কোরবানির মাংস পৌঁছে যায়, তখন যে হাসি ফুটে ওঠে, সেটিই ঈদের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। একটি শিশুর আনন্দ, একজন বৃদ্ধ মানুষের দোয়া কিংবা অসহায় পরিবারের মুখে স্বস্তির হাসি-এসবের মধ্যেই কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়।
গ্রামের ঈদে এই চিত্র আরও গভীরভাবে ধরা পড়ে। ঈদের নামাজ শেষে মানুষ একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন, বাড়িতে বাড়িতে চলে মাংস বিতরণ, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা আর অতিথি আপ্যায়ন। রান্নাঘরে তখন ব্যস্ততা, উঠোনে শিশুদের হাসি, চায়ের কাপে গল্প-সব মিলিয়ে এক অপূর্ব উৎসবের আবহ তৈরি হয়। শহরেও ব্যস্ততার মাঝখানে মানুষ চেষ্টা করেন পরিবারকে সময় দিতে, দূরের আত্মীয়ের খোঁজ নিতে, পুরোনো অভিমান ভুলে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলতে। এই মিলনই ঈদের বড় সৌন্দর্য।
ঈদ আমাদের দায়িত্ববোধের শিক্ষাও দেয়। কোরবানি শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এটি সামাজিক সচেতনতারও পরীক্ষা। পশু জবাইয়ের পর বর্জ্য পরিষ্কার রাখা,পরিবেশ দূষণ না করা এবং অন্যের অসুবিধার কারণ না হওয়া প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। কারণ ধর্ম কখনোই অপরের কষ্টের কারণ হতে শেখায় না। বরং পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতাই ইসলামের অন্যতম শিক্ষা।
আজকের সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের বড় অংশ হয়ে উঠেছে। ঈদের দিন অনেকেই আনন্দ ভাগাভাগির চেয়ে প্রদর্শনেই বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েন। কিন্তু নীরবে কাউকে সাহায্য করার যে তৃপ্তি, তা কোনো ছবিতে প্রকাশ করা যায় না। প্রকৃত ত্যাগ সবসময় নিঃশব্দ হয়। মানুষকে দেখানোর জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা কাজের মধ্যেই ঈদের আসল সৌন্দর্য।
ঈদ উল আজহার আরেকটি বড় দিক হলো সাম্যের শিক্ষা। ধনী-গরিব সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন। একই আনন্দে শামিল হন সবাই। একজন বিত্তবান মানুষ যখন নিজের কোরবানির মাংস দরিদ্র প্রতিবেশীর হাতে তুলে দেন, তখন সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। এই চেতনা যদি সারা বছর ধরে রাখা যেত, তাহলে সমাজের অনেক বৈষম্য ও দূরত্ব কমে যেত।
আসলে ঈদ উল আজহার আনন্দ হাটের কোলাহলে নয়, দামি পশুর গর্বেও নয়। এই আনন্দ মানুষের প্রতি ভালোবাসায়, সহমর্মিতায়, আত্মত্যাগে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টায়। যে পরিবার একসঙ্গে বসে আনন্দ ভাগাভাগি করে,যে মানুষ অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে চায়, যে সমাজ একে অপরের পাশে দাঁড়ায়-সেখানেই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য।
ত্যাগের এই শিক্ষা যদি আমরা শুধু ঈদের কয়েকটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা জীবনে ধারণ করতে পারি, তাহলেই ঈদ উল আজহার সত্যিকারের তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। কারণ কোরবানির মূল চেতনা কেবল পশু কোরবানি নয়; বরং নিজের ভেতরের অমানবিকতাকে কোরবানি করে মানবিক মানুষ হয়ে ওঠা। আর সেখানেই লুকিয়ে আছে ঈদ উল আজহার প্রকৃত আনন্দ।
Comments