স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সেবায় উচ্চ কর ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিতে বড় বাধা: বিশেষজ্ঞরা
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মোবাইল ও টেলিযোগাযোগ বাজার হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সেবার উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, স্মার্টফোন ও টেলিযোগাযোগ সেবার ওপর আরোপিত উচ্চ কর দেশের সামগ্রিক 'ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি'র পথকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে মত দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা।
বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সমাজ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে রোববার (১৭ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে তারা এসব কথা বলেন। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত এই সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—'ডিজিটাল লাইফলাইন: স্ট্রেংদেনিং রেজিলিয়েন্স ইন অ্যা কানেক্টেড ওয়ার্ল্ড'।
সেমিনারে 'ভয়েস ফর রিফর্ম'-এর সমন্বয়ক ও বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম ফাহিম মাশরুর বলেন, "ডিজিটাল অংশগ্রহণ বাড়ানোর সবচেয়ে বড় শর্ত হলো সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা নিশ্চিত করা। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে একটি সাধারণ স্মার্টফোন কিনতেই একজন নিম্নআয়ের মানুষের মাসিক আয়ের প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হয়ে যায়।" অথচ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য এখন স্মার্টফোন ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট অপরিহার্য।
একই সুর মিলিয়ে রবি আজিয়াটা লিমিটেডের করপোরেট ও রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রধান শাহেদ আলম বলেন, শক্তিশালী ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তুলতে সাশ্রয়ী ডিজিটাল সেবার পাশাপাশি মজবুত সাইবার নিরাপত্তাও অত্যন্ত প্রয়োজন।
টেলিযোগাযোগ খাতে কর কমানোর বিষয়ে বিটিআরসির মহাপরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, "নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিটিআরসি বারবার সরকারের কাছে কর কমানোর সুপারিশ করেছে। তবে এই খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর বড় নির্ভরতা থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে কর কমানো কঠিন হচ্ছে।" তবে বিকল্প রাজস্ব উৎস খুঁজে পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে কর কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারী তরুণ উদ্ভাবকদের দেশের বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে প্রযুক্তি ব্যবহারের আহ্বান জানান।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ডিজিটাল সংযোগ এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি। সরকার বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার, বিপিও, ডেটা সেন্টার ও সাইবার নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে আরও এগিয়ে নিতে চায়।
প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি ও টেলিযোগাযোগবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ সরকারের আগামী দিনের মহাপরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন:
আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ ২০ ডিজিটাল অর্থনীতির একটি দেশ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। আগামী ১০ বছরে দেশের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষ ১০ ডিজিটাল অর্থনীতির মধ্যে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। নাগরিক সেবা সহজ করতে 'ওয়ান ডিজিটাল আইডি' ও 'ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট' ব্যবস্থা চালুর কাজ চলছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তরুণদের জন্য 'ইনোভেশন হান্ট' কর্মসূচি শুরু হবে। আগামী ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে স্টার্টআপদের জন্য বিশেষ অনুদান কর্মসূচি চালু করা হবে।
আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে রেহান আসিফ আসাদ জানান, ব্রডব্যান্ড ও ডেটা ব্যবহারে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটলে দেশের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি ১ থেকে ১.৩৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশ মোবাইল গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দেশের মধ্যে থাকলেও সেবার মান, নির্ভরযোগ্যতা ও সাশ্রয়ী মূল্যের দিক থেকে এখনো প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক অনেক দেশের তুলনায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে।
Comments