নতুন মন্ত্রিসভার আকার বড় হবে না
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামীকাল মঙ্গলবার দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথ নেবেন। বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষসহ সব মহলে কৌতূহল রয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য সদস্যদের নানা তালিকা ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে। যদিও এসব তালিকার কোনোটিরই পুরোপুরি সত্যতা নেই বলে বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে।
দলের গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলো বলছে, নতুন মন্ত্রিসভার আকার ৩৫ থেকে ৩৭ সদস্যের হতে পারে। এর মধ্যে ২৬–২৭ জন পূর্ণ মন্ত্রী হতে পারেন। প্রতিমন্ত্রী করা হতে পারে ৯ থেকে ১০ জনকে। শেষ মুহূর্তে আরও এক বা দুজন যোগ হতে পারেন। এর আগে ২০০১ সালে বিএনপির মন্ত্রিসভা ছিল ৬০ সদস্যের। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তখন ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। বিগত সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এবার মন্ত্রিসভা ছোট রাখার চিন্তা করছেন।
দলের গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলো বলছে, নতুন মন্ত্রিসভার আকার ৩৫ থেকে ৩৭ সদস্যের হতে পারে। এর মধ্যে ২৬–২৭ জন পূর্ণ মন্ত্রী হতে পারেন। প্রতিমন্ত্রী করা হতে পারে ৯ থেকে ১০ জনকে। শেষ মুহূর্তে আরও এক বা দুজন যোগ হতে পারেন।
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র বলছে, প্রবীণ-নবীন, অভিজ্ঞ ও দক্ষ নেতাদের নিয়ে এবার মন্ত্রিসভা করতে চান তারেক রহমান। কারা তাঁর মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাবেন, তা অনেকাংশে তিনি নিজেই ঠিক করছেন। এর সঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির একজন নেতাও যুক্ত রয়েছেন। অবশ্য গত শনিবার ও গতকাল রোববার রাতে তারেক রহমান দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে কথা বলেছেন। যদিও এ বিষয়ে নাম উদ্ধৃত করে প্রকাশ্যে কেউ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
প্রবীণ-নবীন, অভিজ্ঞ ও দক্ষ নেতাদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে বিএনপিতে আলোচনা।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা হবেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমদকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুকের নামও বিবেচনায় রয়েছে। এর বাইরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা, জোটভুক্ত দলের নেতা, তরুণ নেতা, জেলা পর্যায়ের নেতা এবং বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় আছে।
কিছু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন-বিতর্ক ছিল
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সুশাসন ও নাগরিক সেবার যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের জন্য সৎ, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের মন্ত্রিসভায় আনা প্রয়োজন। এর কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, ২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির যে সরকার ছিল, তাতে বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এসব মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয়নি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা না করেই তখন সঞ্চালন লাইন বসানো হয়েছিল, যা সে সময় 'খাম্বা'নামে ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত বিষয় ছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় তখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও সমালোচিত হয়েছিল।
২০০১-০৬ সালের সরকারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়েও নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক ছিল। সন্ত্রাস নির্মূলের কথা বলে ২০০৪ সালে র্যাব গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু র্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তখনই উঠেছিল। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় বোমা হামলার ঘটনায় গোয়েন্দা ব্যর্থতাসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এ ছাড়া ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান ও ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ওই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সুশাসন ও নাগরিক সেবার যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের জন্য সৎ, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের মন্ত্রিসভায় আনা প্রয়োজন।
একইভাবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমও তখন প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। রাজধানীতে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে ওই সময় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, যা সরকারকে বিব্রত করেছিল। প্লট বরাদ্দের ওই ঘটনা তখন সংবাদমাধ্যমে 'বিএনপিপল্লি' হিসেবে পরিচিতি পায়। সে সময় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ এনে অর্থায়ন প্রত্যাহার করে একটি দাতা দেশ। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল।
রাজনীতিতে ইতিবাচক ধারার সূচনা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভার রূপ কেমন হবে, তা নিয়ে সব মহলের দৃষ্টি রয়েছে। কারণ, বিএনপির প্রধান তারেক রহমান ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ের পর বিএনপির চেয়ারম্যান জাতীয় ঐক্যের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার রাজনীতি বরদাশত করা হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।
দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বিভাজন দূর করে জাতীয় ঐক্য গড়ার জন্য দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাওয়া বিএনপির চেয়ারম্যানের এই সাক্ষাৎকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
শনিবার আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'দেশ গঠনে আপনাদের চিন্তাভাবনাও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পথ ও মত ভিন্ন থাকতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। আমি বিশ্বাস করি, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।'
এই বক্তব্যের পরদিনই গতকাল জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তারেক রহমান। সরকার গঠনের আগে তাঁর এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ধারার সূচনা হিসেবে দেখছেন। দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বিভাজন দূর করে জাতীয় ঐক্য গড়ার জন্য দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাওয়া বিএনপির চেয়ারম্যানের এই সাক্ষাৎকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
নতুন সরকারের প্রথম দিকেই অর্থনৈতিক 'সিগন্যালিং'(সংকেত দেওয়া) দেওয়াটা খুব জরুরি। মন্ত্রিসভা এবং রাষ্ট্র যাঁরা চালাবেন, তাঁদের বাস্তবভিত্তিক দক্ষতার বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ 'সিগন্যালিং' হবে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান
যোগ্য মানুষদের রাখা ভীষণ প্রয়োজন
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, অন্য মত কিংবা ভিন্নমত—প্রত্যেক নাগরিকের জন্যই আইন সমান।
এসব কাজ করার জন্য মন্ত্রিসভায় সৎ, দক্ষ, কর্মঠ ও দূরদর্শী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
সরকার গঠন করার পর বিএনপির মূল চ্যালেঞ্জ কী হবে, সংবাদ সম্মেলনে এমন এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেছিলেন, দেশের অর্থনীতিকে ঠিক করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বিগত সরকার প্রায় সব প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিকরণ করেছে। সে জন্য সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
এসব কাজ করার জন্য মন্ত্রিসভায় সৎ, দক্ষ, কর্মঠ ও দূরদর্শী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাঁরা বলছেন, নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি বলেছে, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি 'ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন' গঠন করা হবে। এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন সরকারে যোগ্য মানুষদের রাখা ভীষণ প্রয়োজন।
এবার নির্বাচনী প্রচারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বারবার কথা বলেছে বিএনপি। নির্বাচনী ইশতেহারেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে দলটি। বিএনপির এই প্রতিশ্রুতিতে মানুষ যে আস্থা রেখেছে, তা ভোটের ফলাফলেই স্পষ্ট। যে কারণে সরকারে ও প্রশাসনে সৎ ও দক্ষ মানুষদের বিএনপি এগিয়ে নেবে, এমনটি প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় যেসব প্রতিশ্রুতির কথা বলেছেন, তার বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, সেটি মন্ত্রিসভা দেখে অনেকটাই ধারণা পাওয়া যাবে। এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান গতকাল প্রথম আলোয় লিখেছেন, নতুন সরকারের প্রথম দিকেই অর্থনৈতিক 'সিগন্যালিং'(সংকেত দেওয়া) দেওয়াটা খুব জরুরি। মন্ত্রিসভা এবং রাষ্ট্র যাঁরা চালাবেন, তাঁদের বাস্তবভিত্তিক দক্ষতার বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ 'সিগন্যালিং' হবে।
নতুন মন্ত্রিসভায় দক্ষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা আরও কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও মতামতে উল্লেখ করেছেন।
Comments