পুরান ঢাকায় শবে বরাতে সবার পছন্দের হালুয়া-রুটি, কমেছে আগের ঢাক
পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষ্যে পুরান ঢাকায় ঐতিহ্যবাহী হালুয়া-রুটি বিক্রির চিরচেনা উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। শত বছরের সামাজিক রীতি ধরে রেখে এ বছরও অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়কজুড়ে শামিয়ানা টাঙিয়ে বাহারি রুটি ও হালুয়ার পসরা সাজিয়েছেন দোকানি ও হকাররা।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজার, রায়সাহেব বাজার, আরমানিটোলা, নাজিরাবাজার, সূত্রাপুর, নারিন্দা, গেন্ডারিয়া ও লক্ষ্মীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়—ফুল, মাছ, হাঁস, প্রজাপতি এমনকি কুমির আকৃতির নকশায় তৈরি 'ফ্যান্সি' রুটি বিক্রি হচ্ছে। এসব রুটির পাশাপাশি রয়েছে বুট, সুজি, গাজর ও পেঁপের হালুয়া, সেমাই এবং বিভিন্ন ধরনের পিঠা।
দোকানিরা জানান, রুটি তৈরিতে ময়দা, দুধ, ডিম, ঘি, কিশমিশ, সাদা তিল ও কাজুবাদাম ব্যবহার করা হয়। আর হালুয়া তৈরিতে ব্যবহৃত হয় পেঁপে, চালকুমড়া, মিষ্টি কুমড়া, ডাল ও সুজি। আকৃতি ও মানভেদে রুটির দাম কেজিপ্রতি ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। হালুয়া বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৫০ থেকে ৫০০ টাকায়।
তবে দোকানিদের ভাষ্যমতে, এ বছর আগের তুলনায় দোকানের সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রতিযোগিতা বেড়েছে, ফলে বিক্রি তুলনামূলক কম।
গেন্ডারিয়া মোড়ে ছোট একটি রুটির দোকান বসিয়েছেন কামাল মিয়া। প্রায় ২৫ বছর ধরে শবে বরাত এলেই তিনি দোকান বসান। তিনি বলেন, আগে চারপাশে অন্যরকম উৎসবমুখর পরিবেশ থাকত। সবাই সবার বাড়িতে রুটি-হালুয়া পৌঁছে দিত। এখন আর তেমনটা চোখে পড়ে না। দোকান বেশি হওয়ায় বেচাকেনাও আগের চেয়ে কম।
সূত্রাপুর বাজারে 'আল বারাকা হট ব্রেড অ্যান্ড লাইভ বেকারি'-র কর্মচারী সিয়াম বলেন, দুপুর থেকে দোকান বসিয়েছি। অনেকে আসছেন, দেখছেন। তবে দাম শুনে অনেকে না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন। রায়সাহেব বাজার মোড়ে 'কুসুম কনফেকশনারি'-র মালিক আহমদ শরীফ জানান, প্রতি বছরই শবে বরাতে এমন আয়োজন থাকলেও এবার বেচাকেনা আশানুরূপ হচ্ছে না।
লক্ষ্মীবাজারে রুটি কিনতে আসা আয়েশা বেগম বলেন, বাসার সবার জন্য রুটি কিনতে এসেছি। গ্রামে থাকলে নিজেরাই বানানো হয়, কিন্তু শহরের ব্যস্ততায় তা সম্ভব হয় না। তাই ছোট ছেলে-মেয়েদের জন্য দোকান থেকেই রুটি ও হালুয়া কিনে নিচ্ছি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শবে বরাতে হালুয়া-রুটি খাওয়ার কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা না থাকলেও এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এদিন খাবার বিনিময়ের মাধ্যমে আত্মীয়তা ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
সূত্রাপুরে বসবাসকারী রাশেদা বেগম বলেন, শবে বরাত মানেই আমাদের এলাকায় হালুয়া-রুটির আনন্দ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রচলন যেন কমে যাচ্ছে। আগে সবাই সবার বাড়িতে যেত, আনন্দ করত, গল্প করত—এখন সেগুলো কমে এসেছে। তবুও আশা করি, এই ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না।
ইতিহাসবিদদের মতে, উনিশ শতকের শেষ দিকে ঢাকার নবাবদের হাত ধরেই শবে বরাতে হালুয়া ও মিষ্টি বিতরণের রীতি জনপ্রিয় হয়। মুঘল আমল থেকে চলে আসা এই সংস্কৃতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে একটি সামাজিক উৎসবে রূপ নিয়েছে।
Comments