বিএনপির ৩১২ গুমের ঘটনায় ফেরেনি ১০৭, জামায়াতের গুম ৭৪৭—নিখোঁজ ৩৫
শেখ হাসিনার শাসনামলে বিএনপি এবং দলটির অঙ্গসংগঠনের অন্তত ৩১২ নেতাকর্মী গুমের শিকার হন। যাদের ১০৭ জন আর ফেরেননি। তুলে নেওয়া বাহিনীগুলো তাদের হত্যা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ে জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবিরের ৭৪৭ নেতাকর্মী গুম হয়েছেন। তাদের মধ্যে ফেরেননি ৩৫ জন। তারাও হত্যার শিকার হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গুমের শিকার বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ৩৪ শতাংশের বেশি হত্যার শিকার হয়েছেন বা কখনও ফেরেননি। গুমের শিকার জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের ৪ দশমিক ৯ শতাংশ আর ফেরেননি। গুমের শিকার আওয়ামী লীগ এবং যুবলীগের ১১ নেতাকর্মীর কেউ ফেরেননি।
আওয়ামী লীগ আমলের গুমের ঘটনা তদন্তে গঠিত গুম-সংক্রান্ত ইনকোয়েরি কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। কমিশন গতকাল রোববার যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গুমে মূলত ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।
রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়লে, বাড়ত গুম
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনার শাসনামলে চার থেকে ছয় হাজার জন গুম হয়েছেন। তবে কমিশনের কাছে এক হাজার ৯১৩টি অভিযোগ আসে। তদন্তে এক হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। ১১৩টি অভিযোগের সত্যতা মেলেনি। গুমের শিকার ব্যক্তিদের ২৩ জন ছিলেন নারী।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে এক হাজার ২৮২ জনকে পরবর্তী সময়ে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়। ২৫১ জনের আর সন্ধান মেলেনি। তাদের হত্যা করা হয়েছে বলে কমিশন উপসংহারে উপনীত হয়েছে। বাকি ৩৬ জনের লাশ পাওয়া গেছে বিভিন্ন সময়ে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখনও নিখোঁজ ২৫১ জনের মধ্যে ১৫৭ জনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল। যাদের ১০৭ জন বা ৬৮ শতাংশ বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মী। ৩৫ জন বা ২২ শতাংশ জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। ৭ শতাংশ বা ১১ জন আওয়ামী লীগ এবং দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ছিলেন। তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুম থেকে ফেরত আসা ব্যক্তিদের ৯৪৮ জনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। যাদের ৭৫ দশমিক ১ শতাংশ বা ৭১২ জন জামায়াত এবং শিবিরের নেতাকর্মী। সর্বোচ্চ ৪৭৬ জন জামায়াতের নেতাকর্মী এবং ২৩৬ জন শিবিরের। ১৫ শতাংশ বা ১৪২ জন ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মী। ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বা ৪৬ জন ছিলেন ছাত্রদলের। ১৭ জন ছিলেন যুবদলের। বাকি ৩১ জন আওয়ামী লীগ, হেফাজতে ইসলাম, জেএসডি, জাতীয় পার্টিসহ ১৪টি রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সম্পৃক্ত ছিলেন।
এতে আরও বলা হয়েছে, এই পরিসংখ্যান নির্দেশ করে, নির্বিচার গুম করা হয়নি। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ভুক্তভোগীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্র এবং যুব সংগঠনের সদস্য ছিলেন, যা ইঙ্গিত দেয় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় তরুণরা অরক্ষিত ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের সংখ্যার সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ২০০৯ সালে গুম শুরু হলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে গুমের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ২০১৩ সালে ১২৮ জন গুমের শিকার হন, যা আগের বছরের দ্বিগুণের চেয়ে বেশি ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও গুম বাড়ে। ২০১৮ সালে ১৯২ এবং ২০১৭ সালে ১৯৪ জন গুম হন। সবচেয়ে বেশি গুম হয় ২০১৬ সালে ২১৫ জন। ওই বছরের জুলাইয়ে হলি আর্টিসানে জঙ্গি হামলার পর গুম বৃদ্ধি পায়। ২০২১ সালে র্যাবের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় গুম কমলেও ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বৃদ্ধি পায়। ২০০২ সালে ১১০ এবং ২০২৩ সালে ৬৫ জন গুমের শিকার হন।
জড়িত বাহিনীগুলো
সংবিধান অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাউকে গ্রেপ্তারের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু শেখ হাসিনার শাসনামলে তা মানা হতো না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বা সাদা পোশাকের ব্যক্তিরা তুলে নেওয়ার পর গ্রেপ্তারের কথা অস্বীকার করে। তুলে নেওয়া ব্যক্তিকে তিন দিন থেকে এক বছর পর হঠাৎ পাওয়া যেত। কাউকে রাস্তায় ফেলে যাওয়া হতো। তবে বড় অংশকেই কোনো না কোনো মামলায় কারাগারে পাঠানো হতো আদালতের মাধ্যমে। আদালতে তোলার দিন গ্রেপ্তার দেখানো হতো।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে এক হাজার ২৮২ জনকে পরবর্তী সময়ে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়। যাদের মধ্যে ৯৪৮ জনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫ শতাংশ গুমের অভিযোগে র্যাবের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। পুলিশের বিরুদ্ধে ২৩ শতাংশ ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা মিলেছে। ডিবি ১৪ দশমিক ৫ এবং সিটিটিসি ৫ শতাংশ ঘটনায় সম্পৃক্ত। সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ৩৭, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) চারটি ঘটনায় সম্পৃক্ত। সাদা পোশাকের ব্যক্তিরা ৩৭ জনকে তুলে নিয়ে গুম করে। তারা কোন বাহিনীর তা নিশ্চিত করতে পারেনি কমিশন। প্রশাসনের লোক পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় ১১৯ জনকে।
এ ছাড়া র্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে ডিজিএফআই যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করত। ফলে একটি গুমের ঘটনায় একাধিক সংস্থা ও বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। যেমন র্যাব এবং ডিজিএফআই ৪৩ জনকে গুম করেছিল।
শেখ হাসিনা ও ঊর্ধ্বতনরা জড়িত
প্রতিবেদনের বরাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, 'হাই প্রোফাইল' গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানকে গুমের ঘটনা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
কমিশন সদস্যরা জানান, শেখ হাসিনা নিজে অনেকগুলো গুমের ক্ষেত্রে সরাসরি নির্দেশদাতা। তাছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতের কাছে তুলে দেওয়ার যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে স্পষ্ট হয়, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই এগুলো হয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্ত সেনাকর্মকর্তা জিয়াউল আহসান র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) পদে থাকা অবস্থায় সবচেয়ে বেশি গুম হয়েছে।
প্রতিবেদনের যেটুকু অংশ প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে আর কোনো কর্মকর্তার নাম আসেনি। আজ সোমবার কমিশন সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে।
ভুক্তভোগীদের গোপন বন্দিশালায় রেখে হত্যা
কমিশন জানায়, ভুক্তভোগীরা নিশ্চিত করেছেন তাদের র্যাব, ডিজিএফআই পরিচালিত গোপন বন্দিশালায় আটক রাখা হতো। একাধিক ভুক্তভোগী র্যাব-১১ এর বন্দিশালাকে চিহ্নিত করেছে। একজন ২২ বছর তরুণ গুমের পর আর কখনও ফেরেননি। কমিশন সেই তরুণের সঙ্গে গুম করা তাঁর ভাই এবং বন্ধুকে চিহ্নিত করতে পেরেছে। যারা র্যাবের কথা জানিয়েছে।
তদন্ত অনুযায়ী, গুমের শিকার ব্যক্তিদের হত্যা করে সবচেয়ে লাশ ফেলা হয়েছে বরিশালের বলেশ্বর নদীতে। শত শত গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করে এই নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সীগঞ্জেও লাশ গুম করে ফেলার প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেছে। ইচ্ছা করেই লাশ দূরবর্তী স্থানে ফেলা হতো, যাতে লাশ ভেসে উঠলেও অপরিচিত এলাকায় কেউ শনাক্ত করতে না পারে।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ
গুমের দুটি মামলায় শেখ হাসিনাসহ ২৭ জনকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায়। ১২ সাবেক সেনা কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হয়েছেন, বাকিরা পলাতক।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সাক্ষাতে কমিশন সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, তদন্ত কাজে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করায়। তারা বলেছেন, সরকারপ্রধান দৃঢ় ছিলেন বলেই কমিশন কাজ করতে পেরেছে। যা কিছু প্রয়োজন ছিল, সেই সহায়তা পেয়েছেন।
কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, গুমের সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার হতে পারে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের মাধ্যমে আরও ভুক্তভোগীর খোঁজ পাওয়া যায়। যারা যোগাযোগ করেননি। অনেকে বিদেশ চলে গেছেন। ভীতির কারণে অনেকে 'অনরেকর্ড' কথা বলতে রাজি হননি।
কমিশন বলেছে, গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে প্রমাণিত হয়, গুম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ অপরাধ।
মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করে গুমের তদন্ত এগিয়ে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছে গুম কমিশন। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। আরও উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া।
'আয়নাঘরের' ম্যাপিং হবে
কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, যেসব ঘটনা সামনে এসেছে তা পৈশাচিক। বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানকে দুমড়েমুচড়ে দিয়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর কী পৈশাচিক আচরণ করা যেতে পারে, তার ডকুমেন্টেশন গুম কমিশনের প্রতিবেদন। মানুষ কত নিচে নামতে পারে, কত পৈশাচিক হতে পারে, কত বীভৎস হতে পারে– এইটা তার ডকুমেন্টেশন। যারা এই ভয়ংকর, নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে তারা সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। জাতি হিসেবে এই ধরনের নৃশংসতা থেকে চিরতরে বের হয়ে আসতে হবে।
আয়নাঘর হিসেবে পরিচিত গোপন বন্দিশালাগুলোর পাশাপাশি যেসব জায়গায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে, সে জায়গাগুলো ম্যাপিং করতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
Comments