দেয়ালে পিঠ ঠেকে, ছোট সুমন বাহিনী’র আত্মসমর্পণ
সুন্দরবনের নদী-খালে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় 'ছোট সুমন বাহিনী' অবশেষে কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। তবে স্থানীয় পর্যবেক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান, নজরদারি বৃদ্ধি এবং সংগঠনের ভেতরের দুর্বলতা মিলিয়ে এক ধরনের চাপে পড়ে নেওয়া পদক্ষেপ।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুরে মোংলার কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে আত্মসমর্পণের বিষয়টি জানানো হয়। এর আগে ১৭ মে গভীর রাতে সুন্দরবনের নন্দবালা খাল এলাকায় বাহিনীটির প্রধান সুমন হাওলাদারসহ সাতজন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন।
আত্মসমর্পণের সময় তারা ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ এবং ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম জমা দেন। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে বিদেশি পিস্তল, ওয়ান শুটার গান এবং দেশীয় অস্ত্র রয়েছে বলে জানায় কোস্ট গার্ড।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত কয়েক মাসে সুন্দরবনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়। একের পর এক আস্তানা ধ্বংস, অস্ত্র উদ্ধার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় আঘাতের ফলে 'ছোট সুমন বাহিনী'র কার্যক্রম ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে পড়ে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর মতে, প্রথম বড় ধাক্কা আসে বাহিনীর কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আটকের পর। এরপর নেতৃত্ব ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ভেঙে যায়। একসময় যে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা নদীপথে চলাচল ও নিয়ন্ত্রণ করত, তা কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে নদীপথে টহল ও নজরদারি আরও বাড়ানো হলে তাদের জন্য বনে দীর্ঘ সময় অবস্থান ও সংগঠিতভাবে চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কোস্ট গার্ড দাবি করে, গত মার্চে সুন্দরবনের সীমান্ত খাল এলাকায় বাহিনীটির একটি গুরুত্বপূর্ণ আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সেখানে ওয়াকিটকি, গোলাবারুদ ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এরপর এপ্রিল মাসে বাহিনীর 'সেকেন্ড ইন কমান্ড' হিসেবে পরিচিত আব্দুস সামাদ মোল্লাকে অস্ত্রসহ আটক করা হয়।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব ধারাবাহিক ঘটনার পরই সংগঠনটি কার্যত চাপে পড়ে যায়। তাদের ভাষায়, একদিকে নেতৃত্ব ও কাঠামোগত দুর্বলতা, অন্যদিকে নিরাপদ আশ্রয় ও চলাচলের সুযোগ কমে আসা মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে আত্মসমর্পণ ছাড়া বিকল্প খুব কমই ছিল।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সুন্দরবন উপকূল সুরক্ষা নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব নুর আলম শেখ বলেন, আগে দস্যুরা বনের ভেতরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে পারত। এখন নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারির কারণে তাদের চলাচল অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছে।
মোংলার জয়মনি এলাকার জেলে আব্দুল গফুর বলেন, আগে নদীতে নামলেই আতঙ্ক থাকত। এখন পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই স্বাভাবিক। একই এলাকার জেলে মো. সোহেল রানা বলেন, দস্যুদের কারণে মাছ ধরার সময় সবসময় ঝুঁকি থাকত। এখন সেই ঘটনা কমেছে। তবে তিনি চান পরিস্থিতি যেন স্থায়ী হয়।
বনজীবী কালাম বাওয়ালি বলেন, বনের ভেতরে যারা কাজ করেন, তাদের জন্য নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিয়মিত অভিযান থাকলে দস্যুদের প্রভাব অনেকটা কমে যায়। কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে ২৬টি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ২১ জন বনদস্যু আটক এবং ২০ জনকে জিম্মি অবস্থা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ সতর্ক করে বলছেন, শুধু আত্মসমর্পণকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। অতীতেও একাধিক দস্যু বাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও পরে আবার কেউ কেউ অপরাধে ফিরে যাওয়ার নজির রয়েছে।
পরিবেশকর্মী হাসিব সরদার মনে করেন, দস্যুবৃত্তির পেছনে শুধু অস্ত্র বা সংগঠিত চক্র নয়, দারিদ্র্য ও বিকল্প জীবিকার অভাবও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তার মতে, কেবল অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; টেকসই জীবিকার সুযোগ না বাড়ালে নতুন করে ছোট ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠী তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
সব মিলিয়ে স্থানীয় পর্যবেক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, 'ছোট সুমন বাহিনী'র আত্মসমর্পণ সুন্দরবনের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এই অগ্রগতির স্থায়িত্ব নির্ভর করছে ধারাবাহিক অভিযান, পুনর্বাসন এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগের ওপর।
স্থানীয়দের আশা, দীর্ঘদিনের আতঙ্ক কিছুটা কমবে এবং সুন্দরবনের নদী-খালে স্বাভাবিক জীবন ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করবে।
Comments