আমাদের শৈশবের সাদাকালো ঈদ

সময়টা আশির দশক। সাদাকালো যুগ। সে সময় ঈদগুলো কেমন কাটতো আমাদের? রমজান মাসের শেষে ঈদের দিনটি যতই ঘনিয়ে আসতো, মনে মনে আমাদের আনন্দ উত্তেজনা ততই বেড়ে চলতো। ঈদের আগে ঘর-বাড়ি পরিষ্কার এবং অন্যান্য কাজের পাশাপাশি বেশিরভাগ মায়েদের সামান্য অবসরটুকু কেটে যেত ক্লান্তিহীনভাবে সন্তানদের নতুন জামা কাপড় সেলাই করে। একটু সময় পেলে তাঁরা বসে যেতেন সেলাই মেশিন নিয়ে। সে যুগে প্রায় সব বাসায় সেলাই মেশিন ছিল। নতুন জামায় জরির ফিতা, লেস, সুদৃশ্য বোতাম লাগিয়ে কীভাবে জামাটাকে আরো সুন্দর করা যায় সেটা নিয়ে মায়েদের ভাবনার অন্ত ছিলনা। কীভাবে তার ছোট্ট সন্তানের জামাটি অন্য প্রতিবেশী বাচ্চাদের চেয়ে সুন্দর হয় এই নিয়ে মায়েদের মধ্যেও ছিল এক ধরনের সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা। সে যুগে ছিল না বড় কোন শপিংমল বা দোকান। গজ কাপড় কিনে বাসায় বা দর্জির কাছে পছন্দমতো ডিজাইনে জামা বানিয়ে নেয়াই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। আর সেই জামা লুকিয়ে রাখা নিয়ে চলতো আরেক প্রতিযোগিতা। ঈদের আগে কেউ কোনোভাবেই যেন জামাটি দেখতে না পায় তাই ঘরের দরজা বন্ধ করে সেলাই করা হতো সেই জামা। আর সেলাই হওয়ার সাথে সাথে তা ট্রাঙ্কে লুকিয়ে রাখাই ছিলে আমাদের প্রধান কাজ। যাতে বন্ধুরা ঈদের আগে জামাটি কোনোভাবেই দেখে না ফেলে।
এরপরে আসতো সেই চরম প্রতীক্ষার চাঁদরাত। ইফতারের পরেই সবাই মিলে খোলা মাঠে ঈদের চাঁদ দেখতে যাওয়া। সে যুগে খালি চোখে চাঁদ দেখা না গেলে অপেক্ষা করতে হতো বেতার বাংলাদেশের খবরের জন্য । আর চাঁদ দেখার খবর পাওয়া গেলে আমাদের আনন্দ আর দেখে কে? দল বেঁধে গাওয়া হতো রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। আপনাকে আজ বিলিয়ে দেব আসমানে রঙিন'- আব্বাসউদ্দীনের সেই বিখ্যাত গান।
ঈদের দিন ভোরবেলা ফজরের সময় বাবা ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন। চোখ ডলতে ডলতে হাজির হতাম রান্নাঘরে। যেখানে মা আরো আগে শুরু করেছেন ঈদের দিনের রান্না। বাবা এবং বড় বোন তাকে সাহায্য করছেন বিভিন্নভাবে। কখনো পুডিংয়ের জন্য ডিম ফেটে দিচ্ছেন, কখনো মিষ্টি বা লবণ চেখে দেখছেন। কখনো মসলা, চিনি এগিয়ে দিচ্ছেন। সেই রকম এক ঈদে মা সেমাই রাঁধছিলেন কন্ডেন্সড মিল্ক দিয়ে। আমার প্রথম অভিজ্ঞতা হয় কন্ডেন্সড মিল্ক খাওয়ার। সেই ছিল এক মজার অভিজ্ঞতা। একটা ফুটো করে একবারে চোঁ চোঁ করে একমুখ দুধ টেনে নিয়ে খাওয়া। মনে হয়েছিল যেন অমৃত খেলাম। এরপরে অনেক বড়ো হয়েছি। এখন আর কন্ডেন্সড মিল্ক মুখে দিতে পারি না। কিন্তু সেই সময়ের সেই স্বাদ এখনো ভুলতে পারিনি।
ঈদের সকালে গোসল করে বহু প্রতীক্ষিত নতুন জামা জুতো পরে সেমাই লুচি খেয়ে বাবার হাত ধরে যাত্রা করতাম ঈদগাহের দিকে। মেয়ে হওয়াতে ঈদগাঁ মাঠে নামাজ পড়ার সুযোগ ছিল না। তাই আমরা ছোট মেয়ে শিশুরা বাইরে দাঁড়িয়ে বেলুন ও অন্যান্য খেলনা কিনে খেলা করতাম। এরপর বাসায় ফিরে প্রতিবেশী বন্ধুদের বাড়ি বাড়ি বেড়াতে যাওয়া, সবার বাসায় একটু একটু করে খাওয়া আর ঈদ সালামি পাওয়া ছিল ঈদের অন্যতম আনন্দের বিষয়। এরপর বিকেলে বন্ধুরাসহ ঘুরতে যাওয়া, সালামির টাকা দিয়ে রঙিন আইসক্রিম খাওয়া, বায়োস্কোপ দেখা ছিল সবচেয়ে আনন্দের বিষয়।
সবশেষে রাত হলে পাড়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির বাড়ির উঠোনে জড়ো হয়ে সাদাকালো টেলিভিশনে আনিসুল হকের 'ঈদ আনন্দমেলা'দেখা ছিল ঈদের আরেকটি আনন্দের অনুষঙ্গ। এভাবেই আমরা শৈশবের সাদাকালো ঈদের আনন্দ উদ্যাপন করতাম। এখন অনেক বড়ো হয়েছি। এখনকার ঈদের দিনগুলো অনেক রঙিন, অনেক আলো ঝলমল। কিন্তু দিনশেষে মন চলে যায় সেই শৈশবের ঈদের দিনগুলোতে। মনে হয়, আহা! সেই দিনগুলো যদি আরও একবার ফিরে পেতাম।
রুবাইয়াত রিক্তাঃ সাংবাদিক
Comments