ধর্ষণ শুধু নারী নির্যাতন নয়, বৃহত্তর সামাজিক অন্যায়ের প্রকাশ

৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক ক্যাম্পাস হাজারো মেয়ের কণ্ঠে কেঁপে উঠেছে আবার। 'তুমি কে, আমি কে, আছিয়া, আছিয়া' শ্লোগান সমাজের কানে পৌঁছেছে কিনা আমরা জানি না, তবে ধর্ষণ আর নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে এই তোলপাড় করা প্রতিবাদ কেবল ক্যাম্পাসে নয়, সারাদেশেই অনুভূত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তোলপাড় বেশি, কারণ মাত্র কয়দিন আগেই এক নারী শিক্ষার্থীর ওড়না নিয়ে কটুক্তি করা বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক কর্মচারীকে থানা ঘেরাও করে, আদালত চত্বরে বিক্ষোভ করে ফুলের মালা পরিয়ে আর পবিত্র কোরআন শরীফ বুকে জড়িয়ে উল্লাস করেছে তৌহিদী জনতা নামের কিছু মানুষ। উল্টো জীবনের ভয়ে মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছেন সেই নারী শিক্ষার্থী।
গণমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যম যেখানেই নজর পড়ছে, অসংখ্য ধর্ষণের খবর দেখা যাচ্ছে। শিশু, তরুণী বা বৃদ্ধ কেউ বাদ যাচ্ছে না। নারী নির্যাতনের ঘটনাকে কোনও কালের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না। ধর্ষণ আগেও ছিল, এখনও চলছে। ধর্ষণের কোন একটি নির্দিষ্ট ধাঁচ বা ধরন চিহ্নিত করা যায় না। বরং এর বিভিন্নতা দেখে অবাক ও লজ্জিত হতে হয়। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, পরিচিত ও অপরিচিত ব্যক্তি দ্বারা নারী তো ধর্ষিতা হয়েই থাকেন। এ ছাড়াও, দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ, একই ব্যক্তির দ্বারা বিভিন্ন নারীর ধারাবাহিক ধর্ষণ, শাস্তিমূলক বা প্রতিহিংসামূলক ধর্ষণ, পুলিশি হেফাজতে 'ধর্ষণ', রক্ষক দ্বারা ধর্ষণ, জাতিগত ও ধর্মীয় বৈষম্যমূলক ধর্ষণ থেকে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন বা দাঙ্গার সময়ে ধর্ষণ - এ তালিকা শেষ হওয়ার নয়।
কিছু মানুষ যখন ধর্ষণের শিকার নারীর পোশাক-আশাক, স্বভাব-চরিত্র, অসময়ে পথে নামার দুঃসাহস নিয়ে কটাক্ষ করেন বা ধর্ষকের কোনো দল বা পদবি আছে বা নেই, নিয়ে সামাজিক মাধ্যম গরম হয়ে ওঠে, তখন ধর্ষণের শিকার নারীদের মর্যাদা ও সম্মান আরও বেশি করে ভূলুণ্ঠিতই হতে থাকে, প্রতিকার হয় না।
বীভৎস খুন, ডাকাতি, গণডাকাতি, মব ভায়োল্যান্স, অপহরণ যেমন বাড়ছে, তেমনি বেড়ে চলেছে ধর্ষণের ঘটনা। এটি বড় ভাবনার বিষয়। বর্তমানে প্রশাসনে, রাজনীতিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে নারীর যোগদানের ক্ষেত্র বাড়ছে, অর্থনীতিও উন্মুক্ত বাজারে নারীর যোগ্যতা ও দক্ষতার মর্যাদা দিতে এগিয়ে আসছে। সেই সময়টায় নারীর ওপর এমন পীড়ন কেন বাড়ল সে নিয়ে গভীর আলোচনা প্রয়োজন। যারা নারীর চালচলন ও পোশাকের দোষ খুঁজছেন তারা প্রকারান্তরে ধর্ষকের সহযোগী হয়ে উঠছেন। নারীর পোশাক, খোলামেলা আচরণ বা বেশি রাত পর্যন্ত বাইরে থাকার সঙ্গে যারা ধর্ষণের সম্বন্ধ খুঁজে পান, তারা অবশ্যই কোন-না-কোন বিভ্রান্তির শিকার। কারণ, সেই অভিমত আট বছরের আছিয়া বা আশি বছরের কোন বৃদ্ধার ধর্ষণকে ব্যাখ্যা করতে পারে না।
ধর্ষণ কেবলই যৌনইচ্ছা পরিপূরণের উদ্দেশে করা হয় না। পুরুষতন্ত্র,রাজনৈতিক আধিপত্যের সব নকশা বজায় রাখবার একটি উপায় হলো নারীকে ধর্ষণ করা। যতদিন এই আর্থ-সামাজিক সমীকরণটি না বুঝব আমরা ততদিন ধর্ষণ, যৌন নির্যাতনসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ করার জন্য কঠোর আইন করেও কিছু হবে না। আইন আছে, কিন্তু নেই সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ। ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের যতো ঘটনা আমরা জানতে পারি, সেই তুলনায়, এসব অপরাধের দায়ে অপরাধীদের শাস্তির দৃষ্টান্ত পাই কম। অপরাধের শাস্তি যদি অপরাধের আনন্দের চেয়ে কম হয়, তবে সেই অপরাধ বন্ধ হবে কী করে? এই বাস্তবতা দেখেই অপরাধীরা অপরাধকর্মে লিপ্ত হয়। ধর্ষণ শুধু নারী নির্যাতন নয়, বরং বলতে হবে বৃহত্তর সামাজিক অন্যায়ের এক প্রকাশ যার বেশিরভাগ ঘটে ক্ষমতা প্রদর্শনের দুঃসাহস থেকে।
ধর্ষণের ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দেয়া এবং তার প্রতিকার করা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংস অপরাধের রাশ টেনে ধরার জন্য প্রথম কর্তব্য এসব অপরাধের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে গতি সঞ্চার করা। অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীদের গ্রেফতার করতে হবে, যেটা সিলেট ও খাগড়াছড়ির ক্ষেত্রে হয়েছে। কিন্তু শুধু গ্রেফতার করলেই হবে না। একের পর এক ধর্ষণের খবরের পাশাপাশি যদি একের পর এক শাস্তির খবরও আসত, তাহলে ধর্ষণপ্রবণতা হ্রাস পেত বলে মনে করি। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার ও দ্রুতবিচারের উদ্যোগ নেয়াই বড় পদক্ষেপ।
অনেকেই বলেন, মৃত্যুদণ্ড এর উপযুক্ত শাস্তি। কারণ, এই অপরাধ নিপীড়িতার উপরে দীর্ঘকালীন যে দৈহিক-মানসিক ক্ষত তৈরি করে, তা মৃত্যুরই শামিল। বিশ্বের বেশ কিছু দেশে তাই ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ড প্রচলিত রয়েছে। এই বিষয়টা ভেবে দেখবেন মাননীয় বিচারক, বিচারপতি ও নীতি নির্ধারকরা।
সাধারণ মানুষ প্রতিকার চায়। তাই এ নিয়ে অভিযোগের তদন্ত করে অভিযোগ গঠন এবং আদালতে নিষ্পত্তি- এই দুটি জায়গা যদি ত্বরান্বিত না হয় তাহলে বিষয়টি সবসময় উদ্বেগজনক থেকে যাবে। দ্রুত ও যৌক্তিক আইন প্রয়োগই পারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে। সেটি না হলে অপরাধীরা অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ খোঁজে রাজনীতির সাথে তার যোগসাজশকে কাজে লাগিয়ে। আইনের শাসন দুর্বল হয় সেখানেই।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এক অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নারীদের ওপর সম্প্রতি যে জঘন্য হামলার খবর আসছে, তা গভীর উদ্বেগজনক। তিনি বলেছেন, এটি 'নতুন বাংলাদেশ' এর যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
তাঁর এই বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। ভাবতে হবে প্রতিকারের কথা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক শক্তির বড় জাগরণও প্রয়োজন। দরকার, শিশু বয়স থেকেই মেয়েদের মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও স্বাধিকার বোধের ভাবনা জাগিয়ে তোলা। তা হলে তার মধ্যে সামাজিক হীনমন্যতার ভাব জন্মাবে না। ধর্ষক পুরুষ ধর্ষণ করে নারীকে তথাকথিত লোকলজ্জায় ফেলে কাবু করতে চায়। নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র, ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে নারীর মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে ধর্ষণ কমানো সম্ভব না। আর এটা শুধু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সম্ভব নয়। সমাজকে মানতে হবে যে, ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধ শুধুই ধর্ষকের। পাপ, অন্যায়, ধর্ষকের- রাজনৈতিক বিভাজন যে স্তরে যতটাই থাকুক না কেন, এ কথাগুলো সোচ্চার হয়ে বলতে হবে সবাইকে।
লেখক: সাংবাদিক
Comments