সাফল্যের নিয়ামক

যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্রদের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস (যাকে বলা হয় সেশনাল) গ্রুপ অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়। এই গ্রুপগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং হয়। কখনো কখনো যদিওবা পুরোপুরি রোল নাম্বার অনুযায়ী সেশনাল গ্রুপ হয়, কখনো কখনো আবার র্যান্ডম ভাবেও করা হয়। কোন কোন শিক্ষক আবার অনেক বেশি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, তাই তারা ছাত্রদের ইচ্ছামত গ্রুপ করতে দেন। প্রতিটা গ্রুপে দেখা যায় বিচিত্র ধরনের কিছু মানুষ থাকে। কেউ কেউ খুব বেশি হাতে কলমে কাজ করতে পছন্দ করে এবং মনে করে সেশনাল হচ্ছে সেই সুযোগটা কাজে লাগানোর জায়গা। দেখা যায় অন্যদেরকে কাজ না করতে দিয়ে সে নিজেই সব কাজ করার চেষ্টা করে।
এই প্রসঙ্গে আমার এক আরব কলিগের মুখে শোনা একটা ভয়ঙ্কর রকমের স্টিরিওটাইপ কৌতুক মনে এলো। জাপানিদের কাজে ফিলোসোফি হলো, কোন একটি কাজ যদি কেউ করতে পারে তাহলে আমি কেন করতে পারবো না? আর সেই কাজটি যদি কেউ না করতে পারে, তাহলে সেটা আমাকেই তো করতে হবে, তা না হলে আর কে করবে। আরবদের ফিলোসফি হলো, যদি কোন একটি কাজ কেউ করতে পারে, তাহলে তাকেই সেটা করতে দাও। আর যদি কেউ না করতে পারে, তাহলে, মাই ফ্রেন্ড আমি সেটা কীভাবে করব? আমাকে কেন বলছ?
তবে কৌতুকটা মজার হলেও বাস্তবে আমি অলস জাপানি লোক দেখেছি এবং কর্মঠ আরব লোক ও দেখেছি। ইউনিভার্সিটির সেশনাল এর কথায় ফিরে আসি, প্রত্যেকটা গ্রুপে কেউ কেউ থাকে যেমন সব কাজ করতে উৎসাহী, আবার কেউ কেউ থাকে বাইরে তাকিয়ে প্রকৃতি দেখতে বা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে গল্প করে সময় পার করে দিতেই বেশি পছন্দ করে। যেহেতু মার্কিং হয় গ্রুপ মার্কিং, তাই কেউ একজন কাজটা করলেই হলো, অনেকটা ফরজে কিফায়া এর মত। এমন নয় যে শিক্ষকরা এটা খেয়াল করেন না, কিন্তু বাস্তবিক কারনে এসব বিষয়ে মাথা ঘামানো তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। গ্রুপে আবার কেউ কেউ থাকে শুধুমাত্র ডাটা কালেকশন করে। আর অন্তত একজন থাকে যে পুরো এক্সপেরিমেন্ট শেষে এমনভাবে ডাটা কালেকশন করে যেন এক্সপেরিমেন্ট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা যায়। নিশ্চয় সবাই বুঝতে পারছে,আমি কি বলছি, তাই আর ব্যাখ্যায় গেলাম না। আমার আজকের লেখার উদ্দেশ্য ইউনিভার্সিটির সেশনাল গ্রুপ নিয়ে চর্বিত চর্বণ করা নয়। আপনি যদি যেকোনো একটি গ্রুপের কাউকে গিয়ে বলেন সে পুরা এক্সপেরিমেন্টের কত পার্সেন্ট কাজ করেছে তাহলে সে একটা নাম্বার নিশ্চয়ই বলবে। এবার সবার কাছ থেকে আলাদাভাবে নাম্বারটা জেনে নিয়ে যোগ করুন। অবাক হয়ে খেয়াল করবেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যোগফল ১০০ এর চেয়ে বেশি এসেছে,অনেক বেশি। অর্থাৎ বেশির ভাগ মানুষ মনে করে কোনো একটি সংঘবদ্ধ কাজের বেশিরভাগ অংশ সে করেছে, এই সাইকোলজিকাল ব্যাপারটাকে বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন ইগো সেন্ট্রিক বায়াস।
এই ব্যাপারটা কি শুধুমাত্র ভার্সিটির ছাত্রদের জন্য স্পেশাল? মোটেই না। বিভিন্ন সাইন্টিফিক পেপারের একাধিক অথর থাকলে, তাদেরকে জিজ্ঞেস করে দেখা গেছে তাদের বলা কাজের পার্সেন্টেজ এর যোগফল সবসময়ই ১০০ এর চেয়ে বেশি আসে। আসলে সংখ্যাটা গড়ে ১৪০ শতাংশ এর কাছাকাছি আসে। সংসারের দায়িত্বকে কেমন ভাবে পালন করে এটা যদি স্বামী স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হয় তাদের যোগফল ১০০ এর চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। এ তো গেল ভালো কাজের কথা। এবার আসুন যদি জিজ্ঞেস করেন স্বামী এবং স্ত্রী কে, বেশিরভাগ দাম্পত্য কলহ কার কারণে সৃষ্টি হয়, সেটারও যোগফল ১০০ শতাংশের বেশি এসে থাকে কারণ মানুষ নিজেকে বেশি ইম্পর্টেন্ট মনে করে, সেটা ভালো খারাপ যে কোনো কাজের জন্যই হোক। অবশ্য শুধুমাত্র এই বিষয়ে একটা কালচারাল বায়াস রয়েছে, পুরুষতান্ত্রিক দেশগুলো বা সমাজব্যবস্থা গুলোতে এই সংখ্যাটা অনেক বেশি অন্যরকম। সেই বিষয়ে আর কথা বাড়ালাম না।
কিন্তু কেন সকল মানুষ এই ভুলটা করে? তার কাজগুলোর আসল পরিসংখ্যান যতো হওয়া উচিত, সেটাকে কেন ভুল ভাবে চিন্তা করে। কারণ মানুষ নিজে যে কাজগুলো করে সেগুলো কে যেভাবে মনে রাখে, অন্যরা যে কাজগুলো করে তার চারপাশে, সেটাকে ভালোভাবে খেয়াল করে না। এটা তো কেবল আমি কোন একটি সংঘবদ্ধ কাজ এর ব্যাপারে মানুষের নিজের অবদানের কথা কেমন মনে করে সেটা বললাম, এই মানসিকতা আসলে আরো একটি অদ্ভুত ব্যাপার এর জন্ম দেয়। আমার আজকের লেখার উপজীব্য আসলে সেটা।
বাংলাদেশের যেকোনো একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন বুয়েটের কোন ছাত্রকে যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন কিভাবে আপনি বুয়েটে ভর্তি হলেন তাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার কঠোর পরিশ্রম এবং দৃঢ় সংকল্প এর কথা তারা বলবে। কথাটা কি ভুল? মোটেও ভুল নয় কিন্তু কথাটা সম্পূর্ণ নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা ভাগ্য এর যেই ব্যাপারটাও রয়েছে,সেটাকে অগ্রাহ্য করি। আমরা আজকে একটু গাণিতিকভাবে ভাগ্যের কতটা হাত রয়েছে সেটা বোঝার চেষ্টা করব। মজার ব্যাপার হলো ইগোসেন্ট্রিক বায়াস এর কারনে, অনেকেই এই লেখাটা পছন্দ করবেন না বা এই বিষয়ে কথা শুনতে রাজি হবেন না। সফল একজন মানুষ সবসময়ই এটা ভাবতে পছন্দ করেন যে তার সাফল্য এসেছে শুধুমাত্র তার পরিশ্রমের কারণে, ব্যাপারটা সত্য, কিন্তু পুরোটা সত্য নয়। পরিশ্রম ছাড়াও আরো অনেকগুলো বিষয়ে একসাথে কাজ করলেই সাফল্য ধরা দেয়, এর মধ্যে একটি হচ্ছে ভাগ্য। কিন্তু যেহেতু ভাগ্য ভালো বা খারাপ হওয়াতে মানুষ নিজে তার ক্রেডিট দাবি করতে পারে না, তাই সেটা শুনতে চায় না।
ঠিক যেমন দেখতে খুব সুন্দর একজন মানুষ কে যদি আপনি এটা বলেন যে,নিতান্ত ভাগ্য গুনে সে দেখতে সুন্দর, ভালো জেনেটিকস নিয়ে জন্মগ্রহণ করাতে তার নিজস্ব কোন কৃতিত্ব নেই- সে আপনার কথা পছন্দ করবে না। যদিও সুন্দরভাবে উপস্থাপনা ছাড়াও তার সঠিক দেশে, সঠিক সময়ে জন্ম নেয়ার ভাগ্যটা যে এখানে রয়েছে,সেটা কিন্তু সঠিক। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে এবং বিভিন্ন কালচারে মোটা মানুষদেরকে সুন্দর মনে করা হতো, যদিও এখন কোথাও সেটা করা হয় না। কোঁকড়া চুলের মানুষকে এক সময় সুন্দর মনে করা হতো এখন মানুষ চুল সোজা করে। কোন কোন দেশে কোন কোন কালচারে দাঁত ফাঁকা থাকলে সেটাকে সুন্দর ভাবা হতো, কিন্তু এখনো সেটা করা হয় না।
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে বয়সের কারসাজি করাটা খুবই প্রচলিত, তাই বাংলাদেশের জন্য হয়তোবা এখনকার যে বিষয়টা নিয়ে কথা বলবো সেটা প্রযোজ্য হবে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জন্ম তারিখ অনুসারে একটি ছাত্র কবে স্কুলে যাবে এবং কোন কোন অ্যাক্টিভিটিতে অংশ নেবে সেটা নির্ধারণ করা হয়। দেখা যায় কোন একটি নির্দিষ্ট ক্লাসে তা নির্দিষ্ট অ্যাকটিভিটিতে একটি কাট অফ ডেট এর পরে সেই বছরে আর ছাত্র নেয়া হয় না। মনে করেন সেই ডেট হল ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ। তার মানে জানুয়ারি মাসে যাদের জন্ম তারা তাদের কাছে সবচেয়ে বয়স্ক ছাত্র আর ডিসেম্বরের যাদের জন্ম তারা সবচেয়ে কনিষ্ঠ ছাত্র। এক বছর আর এমন কি বা এসে যায়। কিন্তু এখানে একটা দারুণ ট্রেন্ড লক্ষ্য করা যায়। হকি খেলার প্রশিক্ষণ শুরু হবার সময় একটি ব্যাচের যারা যারা একটু বয়স্ক বা উচ্চতা বেশি তারা খেলার মাঠে অন্যদের থেকে একটু ভালো পারফর্ম করে থাকে। আপনার হয়তোবা মনে হচ্ছে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই পার্থক্য অবশ্যই কমে আসবে। কিন্তু একেবারে শুরুর দিকে যারা ভালো পারফর্ম করে তারা আরো ভালো সুযোগ-সুবিধা পায় এবং টিমে জায়গা করে নেয়। তারা বেশি সময় ধরে ফিল্ডে থাকতে পারে এবং প্র্যাকটিস করতে পারে। তারা বেশি বেশি টুর্নামেন্ট খেলে এবং তাদেরকে আরো ভালো করে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পরপর কয়েক বছর এই সুযোগ সুবিধাগুলো যখন তারা অন্যদের চেয়ে বেশি পায় তখন তাদের স্কিল অন্যদের থেকে অনেক ভালো হয়ে যায়। আপনি যদি আমেরিকার প্রফেশনাল হকি প্লেয়ারদের একটি লিস্ট করেন যারা একদম টপচার্টে আছে, অবাক হয়ে খেয়াল করবেন তাদের ৫০% এর জন্মদিন বছরের প্রথম তিন মাসের মধ্যে, মাত্র দশ শতাংশের এর জন্ম শেষ তিন মাসে! তারমানে একজন সফল সফল হকি প্লেয়ার এর অবশ্যই পরিশ্রম এবং দৃঢ় সংকল্প ছিল তার সাকসেসফুল ক্যারিয়ারের পেছনে, কিন্তু তার জন্ম তারিখ এ তার কোন হাত ছিল না। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন হকি প্লেয়ার এটা বলেনি যে সে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে বছরের প্রথম ভাগে জন্ম নেয়ার জন্য।
কিন্তু মোটাদাগে, গাণিতিকভাবেই বছরের প্রথম ভাগে জন্ম নিলে একজন হকি প্লেয়ার এর সাফল্য লাভের সম্ভাবনা বছরের শেষভাগে জন্ম নেয়া হকি প্লেয়ারের ৫ গুণ! কিন্তু শুধুমাত্র আমেরিকার হকি প্লেয়ারদের দোষ দিয়ে লাভ নেই আমরা সবাই কিন্তু এমন।
মনে করুন আপনি আরব বা আফ্রিকা তে অবস্থিত যুদ্ধবিধ্বস্ত কোন দেশে অসময়ে জন্ম নেন নাই, এটা কিন্তু আপনার ভাগ্য। সারা বিশ্বব্যাপী মানুষের ইনকাম এর যে অসমতা লক্ষ্য করা যায়, সেটা কিন্তু তার বসবাস করা দেশ কতটা উন্নত তা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। সেখানে আইনস্টাইনের চেয়েও অনেক প্রতিভাধর মানুষ যদি জন্ম নেয় তাহলে তার সফল হবার সম্ভাবনা কিন্তু ততটা বেশি নয়। তার আয় রোজগার করার পথটাও কিন্তু খুব সংকীর্ণ। হয়তোবা তার বেশিরভাগ বুদ্ধি খরচ হয়ে যাবে কিভাবে পেট চালাবে সেই চিন্তায়। এই কথাগুলো শুনতে আমাদের ভালো লাগার কথা নয়। তার মানে কি আমার পারিপার্শ্বিকতা আমাকে ডিফাইন করে যে আমি কতটা সাকসেসফুল হব? আমার যে এত দৃঢ় সংকল্প এবং পরিশ্রম,তার কোন মূল্য নেই? কেন জানি মানুষ ভাবে,শুধুমাত্র পরিশ্রম কিংবা শুধুমাত্র ভাগ্য দিয়েই সাফল্য আসে জীবনে,কিন্তু সত্যি কথা হলো যেকোনো একটিকে ছাড়া এটা সম্ভব নয়। সাফল্য যতটা পরিশ্রমের উপর নির্ভরশীল,ততটাই ভাগ্যের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু আমার এই লেখার মূল উপজীব্য হচ্ছে আমরা পরিশ্রমের কথা যতটা মনে রাখি ভাগ্য এর কথা ততটা মনে রাখিনা।
১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতার বিশ্ব রেকর্ড গুলোর দিকে তাকান । শীর্ষ আটটি বিশ্ব রেকর্ড যারা করেছেন তারা সবাই অসম্ভব প্রতিভাবান এবং পরিশ্রমী দৌড়বিদ এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু যেই কথাটি রেকর্ডবুকে তেমন ভাবে লেখা থাকে না সেটা হচ্ছে এই আটটি বিশ্বরেকর্ডের সাতটিতেই টেইল উইন্ড ছিল। অর্থাৎ দৌড়বিদরা যেদিকে দৌড় দিয়েছেন ঠিক সেদিকেই বাতাস ছিল এবং তা ভগ্নাংশ পরিমাণে হলেও তাদেরকে আরও দ্রুত দৌড়াতে সাহায্য করেছে। যেহেতু এটা পুরোপুরি ভাগ্য নির্ভর একটি ঘটনা তাই এটিকে উল্লেখ করা হয় না এবং আমরা তা খেয়াল করি না।
ভাগ্য নির্ভর এই নিয়ামক বেশি প্রভাব ফেলে যখন অল্প কোন রিসোর্স কিংবা সুযোগের জন্য বেশি সংখ্যক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। ২০১৭ সালে নাসার এস্ট্রনট ট্রেনিং প্রোগ্রামের জন্য আবেদনপত্র জমা পড়ে ১৮৩০০ এর মধ্যে মাত্র ১১ জনকে ফাইনালি সিলেক্ট করা হয়। এ প্রত্যেকটা প্রতিযোগীকে তাদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং পরিশ্রম এর ভিত্তিতে সিলেক্ট করা হয়েছে। এবার মনে করুন একটা কম্পিউটার সিমুলেশন করা যাক। তাতে প্রতিযোগীদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং পরিশ্রম এর ভিত্তিতে ৯৫ শতাংশ মার্ক দেয়া হল। আর পাঁচ শতাংশ মার্ক দেয়া হল ভাগ্যকে। হয়তো বা সেদিন কারও দিনটাই ভাল গিয়েছে তাই যেটাই সে করতে চেয়েছে সেটা তার প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়েছে,আর কারও কারো দিনটাই খারাপ ছিল,বাকি সব কিছু থাকার পরেও প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজের ফলাফল আসেনি। এই ভাগ্যমূলক মার্ক এর স্কোর র্যান্ডমভাবে সবাইকে দেয়া হল। কিন্তু টোটাল মার্ক কেলকুলেশন করা হল ৯৫-৫ এই অনুপাতে। দেখা গেছে,যদি ১০০০ বার র্যান্ডমভাবে তাদের লাক ফ্যাক্টর এসাইন করা হয় তাহলে প্রতিবারই ভিন্ন ভিন্ন প্রতিযোগী সিলেক্টেড হবে। গড়ে ১১ জন এর মধ্যে ১০ জন নতুন মুখ পাওয়া যায় সিমুলেশন এ! যদি ভাগ্য ফ্যক্টর ৫ শতাংশ এর জায়গায় ১০ শতাংশ হয় তাহলে বুঝতেই পারছেন কি হবে। আর এই লাক ফ্যাক্টরকে যদি একদম শূণ্য ধরা হয় তাহলে যেই প্রতিযোগীদের পাওয়া যায়, সেটাকে লাক ফ্যাক্টর কে শূন্য না ধরে বিভিন্ন শতাংশ অনুযায়ী যোগ করলে কখনোই তাদের সবাইকে পাওয়া যায় না। প্রতিবার যাদের এর স্কোর লাক ফ্যাক্টর বা ভাগ্য নির্ধারক র্যান্ডম স্কোর ৯৪ শতাংশ এর বেশি তারাই সিলেক্টেড হবে।
প্রতিযোগিতা যেখানে যত বেশি তীব্র সেখানে সাফল্য আসার পূর্বশর্ত হচ্ছে মেধা এবং পরিশ্রম। কিন্তু শুধু এই দুটি উপাদান সাফল্যের গ্যারান্টি দেয় না। গাণিতিক ভাবেই এই সিদ্ধান্তে আসার মত যথেষ্ট সিমুলেশন এবং উদাহরণ আমাদের চোখের সামনে রয়েছে। বাংলাদেশ এবং ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে এই উদাহরণটি হয়তোবা প্রাসঙ্গিক হতে পারে। আমেরিকাতে ভিন্নদেশের ডাক্তারদের রেসিডেন্সির মাধ্যমে ডাক্তারি লাইসেন্স পেতে হয়। সেখানেও প্রতিযোগিতার খুবই তীব্র এবং লাক ফ্যাক্টর ভালোভাবেই দৃশ্যমান হয়।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ তাদের সৌভাগ্যের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল থাকেনা কারণ সেটা সে পরিশ্রম করে অর্জন করেনি। আমাদের জীবনসঙ্গীরা বাসায় কাজকর্ম করে আমাদের জীবনকে যেটুকু সহজ করে দেয় এবং আমাদেরকে বিভিন্ন অন্যান্য কাজে মনোনিবেশ করার মতো যথেষ্ট সময় বের করে দেয়, সেটাকে আমরা বেশিরভাগ সময়ই অ্যাপ্রিশিয়েট করতে পারিনা।
এবার একটি সারপ্রাইজিং কথা বলব। আমাদের সাফল্যের উপরে ভাগ্যের যে প্রভাব রয়েছে সেটাকে অগ্রাহ্য করলে আমাদের সাফল্যের সম্ভাবনা বরং বৃদ্ধি পায়! কারণ আমরা যদি অনিশ্চিত থাকি, যেকোনো একটি কাজের ফলাফল কি হবে,তাহলে সেই কাজটির পেছনে আমাদের পরিশ্রম করার মানসিকতা কমে আসে। আর যেহেতু পরিশ্রম করার মানসিকতা কমে যায় সেহেতু সাফল্যের সম্ভাবনা কমে যায়। সুতরাং আমরা যদি এই ভুল বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে থাকি যে,আমার সাফল্যের একমাত্র নিয়ামক হচ্ছে দৃঢ় সঙ্কল্প এবং পরিশ্রম তাহলে গাণিতিকভাবেই আমার সাফল্যের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। বলা যায় এটি হচ্ছে একটি উপকারী অন্ধবিশ্বাস,যে আমার ভাগ্য আমার নিয়ন্ত্রনে রয়েছে। সম্প্রতি আমি একটি রেস্টুরেন্ট পরীক্ষামুলকভাবে খুলেছি বাংলা খাবারের। আমি যদি আগে জানতাম যে এটি করতে কতটা পরিশ্রম করতে হবে এবং কতটা অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে আমাকে যেতে হবে এবং কতটা ভাগ্য নির্ভর বিষয় নিয়ে আমাকে ডিল করতে হবে,তাহলে আমি হয়তোবা কখনোই এ পথে পা বাড়াতাম না।
কিন্তু এই অন্ধবিশ্বাসের আরও একটা দিক রয়েছে। ভাগ্যবান মানুষ সমাজের অসমতার সুফলভোগী। প্রাকৃতিকভাবেই মানুষ অসমতা পছন্দ করেনা। তাই নিজের এই ভাগ্য টাকে- পরিশ্রম,সাহস এবং সংকল্প এর ফলাফল দিয়ে জাস্টিফাই করা সহজ হয় মানুষের জন্য। সমাজে বেশিরভাগ বিত্তবান এবং ক্ষমতাধর মানুষ নিজেদের বুদ্ধিমত্তা,ধৈর্য এবং সৎ সাহস এর ফলাফল হিসেবে তাদের অবস্থানকে সবার কাছে তুলে ধরেন এবং এটা কোন অযৌক্তিক ব্যাপার নয় , যদিও পুরোপুরি সঠিক নয়।
একবার একটি সাইকোলজিকাল পরীক্ষা করা হলো। কিছু মানুষকে তিনজন করে গ্রুপে ভাগ করে একটি নৈতিক ব্যাপার নিয়ে খুব জটিল আলোচনা করতেন বলা হলো। প্রত্যেক গ্রুপে দৈবভাবে একজন গ্রুপ লিডার অ্যাসাইন করা হয়েছিল। কিছুক্ষণ আলোচনার পরে একটি স্নাক্স ব্রেকে প্রত্যেকটা গ্রুপকে চারটি করে বিস্কুট দেয়া হলো। দেখা গেল বাড়তি যেই বিস্কুট রয়ে গিয়েছিল, সেটি দলনেতার কাছেই সবাই দিয়ে দিল যদিও দলনেতার আলাদা কোন কোয়ালিফিকেশন ছিল না। পুরোপুরি ভাগ্যগুণে তারা এই পজিশনটি পেয়েছিল। ভাগ্যগুণে কোন একটি স্ট্যাটাসে যখন মানুষ পৌঁছায় তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে নিজেকে তার যোগ্য বলে মনে করে। এবং সাথে সাথেই দেখা যায় আরো অনেক আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা সেই পথ ধরে আসতেই থাকে। যদি কখনো বিমানের বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ করে থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন সাধারণ ক্লাসের প্যসেঞ্জার এর চেয়ে বিজনেস ক্লাসের প্যাসেঞ্জারদের অ্যাভারেজ বিহেভিয়ার কম মার্জিত।
আরেকটি সাইকোলজিকাল এক্সপেরিমেন্ট কথা বর্ণনা করা যায়। পার্টিসিপেন্টদের কে তিনটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছিল । প্রত্যেক গ্রুপকে বলা হলো তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া সম্প্রতি কিছু ভালো ঘটনা এর কথা মনে করতে । এবং এই ভালো ঘটনার পেছনে প্রথম রূপকে বলা হলো তাদের কোন কোন গুন বা কাজ প্রভাব রেখেছে সেগুলো লিস্ট করতে । দ্বিতীয় গ্রুপকে বলা হল এই ঘটনার পিছনে কি কি সৌভাগ্য কাজ করেছে যেগুলোর পেছনে তাদের কোন হাত ছিল না সেগুলো লিস্ট করতে । আর তৃতীয় গ্রুপকে বলা হলো ঘটনার কারণ সাধারণভাবে বর্ণনা করতে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই রোগকে বলা হয় কন্ট্রোল গ্রুপ। এই কাজের শেষে তাদেরকে কিছু সম্মানী দেয়া হলো এবং তারা এই টাকা গুলো ডোনেট করে দিতে পারেন। মজার ব্যাপার হলো যেই গ্রুপ তাদের পরিশ্রমের কথা বর্ণনা করেছে তাদের তুলনায় যেই হোক সৌভাগ্যের কথা বর্ণনা করেছে তারা ২৫% বেশি টাকা দান করেছে। আর কন্ট্রোল গ্রুপ ছিল এই দুইয়ের মাঝামাঝি।
চলুন এই ফলাফল আমাদের সামাজিক জীবনে কিভাবে প্রভাব রাখে সেটা বিবেচনা করা যাক । বিশেষভাবে যারা সমাজে ব্যবসায়িকভাবে খুব সফল এবং রাজনৈতিক নেতা। এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে তাদের বেশিরভাগই অসম্ভব মেধাবী এবং পরিশ্রমী। তাদের যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু তারা বাকি সবার চেয়ে অনেক বেশি ভাগ্যবান। বেশিরভাগ মানুষের মতোই তারাও এই ব্যাপারটি মনে রাখেন না কিংবা মানতে চান না। এই কারণে তাদের বাস্তব জগৎ সম্পর্কে যে ধারণা বা জীবনবোধ,সেটা কিন্তু মোটেই বাস্তবসম্মত নয়।
তাদের এই পার্সপেক্টিভ কে বলা হয় সার্ভাইভার বায়াস। কোন বিপদ সঙ্কুল পরিবেশে যখন অনেকে একসাথে সহযাত্রী হয়, তাদের অভিজ্ঞতা সবার এক হয় না। যারা বেঁচে থাকেন তাদের সেই বিপদসংকুল পরিবেশটাকে অবশ্যই যারা বেঁচে থাকেন না কিংবা ফেইল করেন তাদের চেয়ে কম কঠিন মনে হয়। অবশ্যই সাফল্যের দেখা তারা পেয়েছেন চরম পরিশ্রমের মাধ্যমে। তাই সারা দুনিয়াকে তাদের কাছে ফেয়ার মনে হয়। একই রকম পরিশ্রম কিন্তু তাদের অনেক সহযাত্রী করেছিল কিন্তু সাফল্যের দেখা পায়নি। তাদের দুর্ভাগ্যের কথা সফল হওয়ার ব্যক্তিরা খুব একটা মনে রাখেন না কিংবা রাখলেও এটা ভাবেন যে যোগ্যতর হিসেবেই তিনি জয়ী হয়েছেন। তাদের কাছে জীবনটা একটি ফেয়ার জায়গা, যেখানে পরিশ্রমের ফলাফল সাফল্যের মাধ্যমে পাওয়া যাবেই। যেই অভিজ্ঞতাটি তাদের জীবনে নেই সেটা হচ্ছে অসংখ্য মানুষ তাদের থেকেও বেশী পরিশ্রম করেছে এবং যোগ্যতায় তাদের থেকেও বেশি ছিল কিন্তু তারা সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাতে পারেনি। ওইসব মানুষের কাছে আবার দুনিয়াটা মোটেই ফেয়ার নয়। কিন্তু সফল ব্যক্তিরা ব্যর্থদের সম্পর্কে ভাবেন, তারা নিশ্চয়ই সে ভাবে পরিশ্রম করে নি। অথবা তারা সেরকম দক্ষ কিংবা যোগ্য ছিল না। দুঃখের কথা হচ্ছে এই রকম চিন্তা মানুষকে সমাজের প্রতি কম সংবেদনশীল করে তোলে এবং পরোপকার করার প্রবণতা কমিয়ে দেয়। ভুলে গেলে চলবে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সকল মানুষগুলোই নির্ধারণ করে সমাজ সংসার কিংবা রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালিত হবে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হচ্ছে সফল ব্যক্তিরা তাদের নিজস্ব দক্ষতা এবং পরিশ্রম কে যেভাবে মূল্যায়ন করেন সেভাবে তাদের ভাগ্যকে মূল্যায়ন করেন না। আর যেহেতু ভাগ্যকে মূল্যায়ন করেন না, সেহেতু পারিপার্শ্বিক যেই যেই ফ্যাক্টরগুলো তাদের সফলতার পিছনে ভাগ্য হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে সে গুলোকে মেইনটেইন করার কথা ভাবেন না।
আনন্দের ব্যাপার হলো, ভাগ্যের যে হাত রয়েছে সাফল্যের পেছনে সেটাকে স্বীকার করে নিলে অনেকদিক দিয়ে লাভবান হয় মানুষ। প্রথমটি হচ্ছে আমাদের বাস্তব জগতের সম্পর্কে ধারণাটা আরো বাস্তবের কাছাকাছি হয়। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে যারা এটাকে স্বীকার করেন তাদেরকে অন্যরা বেশি পছন্দ করেন। আরেকটি সাইকোলজিকাল এক্সপেরিমেন্টের কথা বর্ণনা করা যাক । একটি বায়টেক কোম্পানির সাফল্যের কথা বর্ণনা করে একটি প্রবন্ধ পড়তে দেয়া হয়েছিল কিছু মানুষকে। এই প্রবন্ধের শেষ প্যারাগ্রাফটা 2 ভাবে লেখা হয়েছিল। একটিতে বলা হয়েছিল, সে কোম্পানির মালিক কোম্পানি সাফল্যের পেছনে তার পরিশ্রম এবং দৃঢ় সংকল্পের কথা ব্যক্ত করেছেন। আর আরেকটিতে লেখা হয়েছিল, কোম্পানির মালিক বলেছিলেন কিভাবে সবার সাহায্যে এবং ভাগ্যের বেশ কিছু প্রভাবে তাদের সাফল্য এসেছিল। যারা প্রথম ভার্সনটি পড়েছিল তাদের থেকে যারা দ্বিতীয় ভার্সনটি পড়েছিল, তারা কোম্পানির মালিক কে দয়ালু এবং বন্ধুসুলভ মনে করেছিল এবং ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে পরিচিত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। নিজের সৌভাগ্যের কথা মনে রাখলে মানুষ বেশি সুখী অনুভব করে, কারন তাতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি জায়গা তৈরি হয়।
কিন্তু আমাদের পারিপার্শ্বিকতা এবং সাইকোলজির কারণে আমাদের ব্রেইন আমাদের সৌভাগ্যকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করে। এ কারণেই যারা কোনো একটি বিষয়ে সফল, তারা সেই বিষয়ে ব্যর্থ মানুষকে অলস এবং কম প্রতিভাবান মনে করতে চায়। এরপরে আমাদের কালচারাল বায়াস, প্রেজুডিস আর ডিসক্রিমিনেশন তো রয়েছেই। ভারতের লোয়ার কাস্টের মানুষের অভিজ্ঞতা যারা জানেন তারা এই বিষয়টা ভালোভাবে কানেক্ট করতে পারবেন।
শেষ করার আগে মনে হয় আমার বলা উচিত - জীবনে তাহলে সাফল্য পেতে হলে আমাদের কিভাবে চিন্তা করা উচিত। হাস্যকর ব্যাপার হলো সম্পূর্ণ বিপরীত ধর্মী দ্বিচারিতামূলক একটি আচরণ করতে হবে। প্রথমে বিশ্বাস করতে হবে যে আমার জীবনের নিয়ন্ত্রণ আমার হাতেই । দৃঢ় সংকল্প এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে সেটি অর্জন করা সম্ভব। সেভাবেই সকল ক্ষেত্রে আচরণ করতে হবে। কিন্তু মনে মনে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে এই কথাটা সম্পূর্ন ভুল। কেননা ভাগ্যের একটা বিরাট অবদান আছে সাফল্যের পেছনে এবং সেটা গাণিতিকভাবে প্রমাণ করা সম্ভব। বিপরীত ধর্মী এই বিশ্বাসটা নিজের ভেতরে থাকলে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং সংবেদনশীল হওয়া যায় । আর তাতে অন্যরা বেশি পছন্দ করে মানুষকে। একবার যদি সাফল্য হাতে ধরা দেয় তাহলে এই বিপরীতধর্মী বিশ্বাস থেকেই সমাজের প্রতি বা অপরের প্রতি ভাল কিছু করার দায়িত্ব পালন করার তাড়নাটা থেকে যাবে।
সূত্রঃ ভেরিটাসিয়াম ইউটিউব চ্যানেল
লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বৈদ্যুতিক গাড়ি বিশেষজ্ঞ
Comments