ট্রাম্পের চাপে কঠিন বিপদে জেলেন্সকি

গত ১৯ ফেব্রুয়ারী প্রভাবশালী ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দ্যা ইকোনোমিস্ট একটি রিপোর্টের শিরোনাম করেছে, 'Team Trump wants to get rid of Volodymyr Zelensky, যার অর্থ করলে দাঁড়ায়, 'ভলোদোমির জেলেন্সকি থেকে মুক্তি চায় ট্রাম্প টিম'। এর দুই দিন পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জেলেন্সকি-কে 'অনির্বাচিত একনায়ক' বলে আক্রমণ করেছেন। কিছুটা আক্রমণাত্মক হলেও ট্রাম্পের কথায় যুক্তি দেখছেন অনেকে, কারণ ট্রাম্প বলছেন, 'জেলেন্সকি এমন একটা যুদ্ধ করতে গেছেন, যেটা জেতা সম্ভব নয়, যেটা শুরুই হওয়া উচিত ছিল না'।
আগামীকাল ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের তিন বছর পূর্তির সময়টায় জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে দেশটির প্রেসিডেন্ট জেলেন্সকির ভবিষ্যৎ নিয়ে। ট্রাম্প চান যুদ্ধ থামুক, সমঝোতা হোক। কিন্তু কীসের ভিত্তিতে? রাশিয়া ইউক্রেনের যে পরিমাণ অঞ্চল দখলে রেখেছে সেগুলো রাশিয়ার দখলে রেখেই সমঝোতা? এই প্রশ্নটাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে পুরো ইউরোপে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বহু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর ছারখার হয়ে গেছে রাশিয়ার আক্রমণে। তবুও পরাক্রমশালী রাশিয়ার আগ্রাসনের কাছে কোনভাবেই মাথা নোয়ায়নি ইউক্রেন। বরং ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যুদ্ধ করে চলেছে ইউক্রসের সৈনিকরা। রাশিয়ার তুলনায় অনেক ছোট দেশ হয়েও যেভাবে যুদ্ধ করছে ইউক্রেন তা নজর কেড়েছে আন্তর্জাতিক মহলের। তবে তা সম্ভব হয়েছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের তরফ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অস্ত্র সহায়তার কারণে। বাইডেনের কারণে পশ্চিম ইউরোপও বড় আকারে সাহায্য করেছে ইউক্রেনকে।
নির্বাচনে বাইডেনের পরাজয় জেলেন্সকির জন্য বড় বিপদ ডেকে এনেছে। সম্প্রতি মার্কিন উদ্যোগে যুদ্ধ বন্ধ করতে সৌদি আরবে আমেরিকা-রাশিয়া বৈঠক ডাকা হলেও সে বৈঠকে ইউক্রেনকে রাখা হয়নি। আবার পুতিনের সাথে কথা বলার পর ট্রাম্পের যেসব বক্তব্য আসছে সেগুলো কোনটাই ভলোদোমির জেলেন্সকির জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। মনে হচ্ছে বেশিরভাগ কথা তিনি বলছেন রাশিয়ার হয়ে। পুতিনকে কিছু না বলে ইউক্রেনীয় নেতাকে একনায়ক বলে অভিহিত করেছেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে আরও একটি কারণে। ট্রাম্পের নজর পড়েছে ইউক্রেসের বিরল খনিজ পদার্থের ওপর। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনকে বলেছিলেন, নিরবচ্ছিন্ন মার্কিন সহায়তা পেতে চাইলে ৫০০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের বিরল খনিজ ওয়াশিংটনকে দিতে হবে। এখন ট্রাম্প এই দাবির দ্রুত বাস্তবায়ন চান। যত দ্রুত সম্ভব ইউক্রেনের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ৫০ শতাংশ চেয়েছিল, যার মধ্যে রয়েছে গ্রাফাইট, ইউরেনিয়াম, টাইটানিয়াম ও লিথিয়াম। এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদিত করতে চান। কিয়েভের জন্য আরও মার্কিন সামরিক সহায়তা অনুমোদনের আগেই সেটা করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনার উদ্যোগও নিতে চান তিন বছর ধরে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটে।
যদি যুদ্ধ থামাতে হয়,খনিজ পদার্থ ট্রাম্পের হাতে তুলে দিতে হয়,তাহলে জেলেন্সকির ভবিষ্যৎ কী? এই প্রশ্ন এখন ইউরোপের। ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে বিভাজন যে গভীর তা বোঝা যায় ট্রাম্পের এক উপদেষ্টার বক্তব্যে। উপদেষ্টা জেলেনস্কি সম্পর্কে বলেন, 'অবশ্যই, আমাদের এই লোকটিকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনতে হবে।'
সেই বাস্তবতা আসলে কোন বাস্তবতা সেটাই বিবেচ্য। ট্রাম্প বলছেন,'পুতিন চাইলে পুরো ইউক্রেন দখলে নিতে পারেন। যদি জেলেন্সকি ইউক্রেনকে বাঁচাতে চান,তাহলে তার শান্তি চুক্তি করা উচিত।' বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন জেলেন্সকি নিজেও। মার্কিন সংবাদ মাধ্যম এনবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন,'মার্কিন সামরিক সাহায্য ছাড়া ইউক্রেনের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন'।
লেখক : সাংবাদিক
Comments