দুর্গাপূজার প্রস্তুতি: প্রতিমার গায়ে রং-তুলির শেষ আঁচড়
শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠজুড়ে কাশফুলের দোলা আর শিউলির সুবাস, প্রকৃতিজুড়ে বইছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা। দেবী দুর্গার আগমনে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে চাঁদপুরের আট উপজেলায়। পূজাকে ঘিরে কোথাও চলছে প্রতিমার গায়ে রং-তুলির শেষ আঁচড়, কোথাও প্যান্ডেল নির্মাণ ও আলোকসজ্জার কাজ। প্রতিমা তৈরি থেকে শুরু করে মণ্ডপের সাজসজ্জা সবখানেই এখন শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা।
এ বছর চাঁদপুর জেলার আট উপজেলায় ২৩২টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। দুর্গোৎসবকে আনন্দমুখর ও নির্বিঘ্ন করতে আয়োজকদের পাশাপাশি প্রশাসন, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নিয়েছে নানা প্রস্তুতি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মণ্ডপগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, নজরদারি বৃদ্ধি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুর সদরে ৪১টি, ফরিদগঞ্জে ২৩টি, হাইমচরে ৬টি, হাজীগঞ্জে ২৯টি, মতলব দক্ষিণে ৩৯টি, মতলব উত্তরে ৩৬টি, কচুয়ায় ৩৯টি এবং শাহরাস্তিতে ১৯টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
সরেজমিনে চাঁদপুর শহরের কালীবাড়ি মন্দির প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপ সাজানো, প্যান্ডেল তৈরি ও আলোকসজ্জার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগর ও আয়োজকেরা। সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে দেবী দুর্গা, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও লক্ষ্মীর প্রতিমা। কোথাও প্রতিমার গায়ে রং লাগানো হচ্ছে, কোথাও চলছে অলংকরণ ও শেষ মুহূর্তের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। মাটি, খড় ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে ধাপে ধাপে গড়ে তোলা প্রতিমাগুলো এখন পূর্ণতা পাওয়ার অপেক্ষায়।
এবার বিভিন্ন মণ্ডপ সাজানো হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন থিমে। উৎসবের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি ইতিবাচক ও মানবিক মূল্যবোধের বার্তা তুলে ধরতে কোথাও দেশের গুণীজনদের ছবি, কোথাও উপদেশমূলক বাণী স্থান পাচ্ছে মণ্ডপের সাজসজ্জায়।
প্রতিমা নির্মাণশিল্পী জগবন্ধু পাল বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও তাঁরা দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। বাইরে প্রতিমা তৈরির কাজ অনেকটাই শেষ হলেও কারখানার কিছু কাজ বাকি রয়েছে। এ বছর তাঁরা ১২টি প্রতিমা তৈরির কাজ নিয়েছেন। বর্তমানে ছয়জন মিলে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। পাট ও মাটির দামও আগের তুলনায় বেশি। কাজের শুরুতে ব্যস্ততা ও চাপ থাকলেও প্রতিমা তৈরি শেষে মণ্ডপে স্থাপন করা হলে অন্যরকম আনন্দ অনুভব করেন তাঁরা। তবে উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার লোকসানের আশঙ্কাও রয়েছে।
কালীবাড়ি মন্দিরের পূজা আয়োজক প্রভাষ সাহা বলেন, গত দুই মাস ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে। পূজার পাঁচ দিন দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য মহাপ্রসাদের ব্যবস্থা থাকবে। দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও বিদেশ থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। এবার প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ মানুষের সমাগম হবে বলে প্রত্যাশা করছেন আয়োজকেরা।
চাঁদপুর জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক বিনয় ভূষণ মজুমদার ও সদস্য সচিব অজিত সাহা জানান, জেলার আট উপজেলায় ২৩২টি মণ্ডপে সাড়ম্বরে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপনের লক্ষ্যে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিমা নির্মাণের পাশাপাশি মণ্ডপ সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে।
এদিকে দুর্গাপূজা সুন্দর ও নির্বিঘ্নে উদযাপনের লক্ষ্যে প্রস্তুতিমূলক সভা করেছে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ। সভায় নিরাপত্তা, সমন্বয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধ এবং পূজামণ্ডপের সার্বিক পরিবেশ নিয়ে আলোচনা হয়।
চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলসহ সবার সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সুন্দরভাবে পূজা উদযাপন সম্ভব। মণ্ডপগুলোতে সামর্থ্য অনুযায়ী সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। কোথাও কোনো সন্দেহজনক ঘটনা বা অপতথ্য ছড়ালে তা দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে। পূজাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, সবাই মিলে উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন করতে হবে। পূজামণ্ডপগুলোকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং কঠোর নজরদারি রাখা হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য প্রচার ঠেকাতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে পূজা উদযাপন পরিষদের পাশে থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, পূজার সময় পৌরসভাগুলোকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো মণ্ডপে সমস্যা দেখা দিলে প্রশাসনকে জানাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়ালে জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমেও অবহিত করা যাবে। পূজার সময় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে আলাদা মেডিকেল টিম রাখা হবে। মণ্ডপের আশপাশে দোকান বা বাজার থাকলেও মেলা বসানো যাবে না। পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হবে।
চাঁদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ও চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক বলেন, পূজায় দলীয় নেতাকর্মীরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে মণ্ডপ কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন। নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনে যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়ে তাঁরা সতর্ক থাকবেন। এ বিষয়ে দলীয় প্রধান তারেক রহমানেরও নির্দেশনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, আগামী ১৫ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে ছয় দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসব। ২১ অক্টোবর প্রতিমা বিসর্জন ও বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের আয়োজন।
সব মিলিয়ে চাঁদপুরের ২৩২টি পূজামণ্ডপে এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমায় রং-তুলির শেষ আঁচড়, মণ্ডপে আলোর ঝলকানি আর উৎসবের অপেক্ষায় ভক্ত-দর্শনার্থীরা। আয়োজকদের প্রত্যাশা, প্রশাসন ও সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতায় সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও আনন্দের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
Comments