রেলে বাসা বরাদ্দে অনিয়ম ও সরকারি নথি গায়েবের অভিযোগ; প্রশ্নের মুখে সাবেক ডিআরএম সফিকুর
বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগে সরকারি আবাসন বরাদ্দে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে পছন্দের লোকজনকে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, প্রাধিকারের চেয়ে কয়েক গুণ বড় কোয়ার্টার বরাদ্দ, পিআরএল-সংক্রান্ত বিধি উপেক্ষা এবং অনতিব্দে বাসা বরাদ্দের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি গায়েব করার মতো ঘটনা ঘটেছে।
অভিযোগের তির বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বর্তমান চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (সিওপিএস) ও সাবেক বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম, ঢাকা) সফিকুর রহমানের দিকে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভুক্তভোগী কর্মচারীরা এসব অনিয়মের দালিলিক প্রমাণসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করলেও দীর্ঘ সময়েও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় রেলের আবাসন ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নথি ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সফিকুর রহমান ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিভাগের ডিআরএম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভুক্তভোগী কর্মচারীদের দাবি, দায়িত্বকালে তিনি চরম গোপনীয়তা বজায় রেখে বাসা বরাদ্দের ফাইল অনুমোদন করতেন। একটি বিতর্কিত বরাদ্দ আদেশে দেখা যায়, তিনি ২০২৪ সালের ৯ মে স্বাক্ষর করলেও তা প্রকাশ করা হয় প্রায় পাঁচ মাস পর, ১৭ অক্টোবরে। স্বাক্ষরের তারিখ ও প্রকাশের তারিখের এই অস্বাভাবিক ব্যবধান নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা গুঞ্জন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সরকারি নথিপত্র গায়েবের ঘটনা। পদ থেকে সফিকুর রহমানের বদলির পরপরই তাঁর দপ্তরের বাসা বরাদ্দ সংক্রান্ত একাধিক ফাইল আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কর্মচারীদের ধারণা, এসব নথি উদ্ধার করা গেলে আবাসন বরাদ্দের আরও বড় ধরনের অনিয়মের চিত্র সামনে আসবে।
১৯৮৮ সালের আবাসন নীতিমালা এবং ২০১৬ ও ২০২১ সালের সংশোধিত পরিপত্র অনুযায়ী, কোনো কর্মচারীর পিআরএল (অবসরোত্তর ছুটি) শেষ হওয়ার ৩০ দিন আগে তাঁর নামে থাকা বাসা অন্য কারও অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু এখানে এই নিয়ম পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে।
একই সঙ্গে পদের প্রাধিকার ডিঙিয়ে বড় বাসা হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে, মো. কামরুজ্জামান পাটোয়ারী সিএস টাইপের সর্বোচ্চ ৮৫০ বর্গফুট বাসা পাওয়ার নিয়ম থাকলেও জ্যেষ্ঠতা ডিঙিয়ে তাঁকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১,৬৫৯ বর্গফুটের 'সি/৬/এইচ' বাসা। মো. খায়রুল ইসলাম ১৯তম গ্রেডের এই ওয়েম্যানের (গ্যাং-৪) প্রাধিকার অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৪০০ বর্গফুটের বাসা পাওয়ার কথা। তবে তাকে দেওয়া হয়েছে ১,২২০ বর্গফুটের বিশাল কোয়ার্টার যা প্রাধিকারের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বড়।
এ ধরনের অবৈধ বরাদ্দের কারণে সরকার যেমন বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে, তেমনি ডিইএন/৩/ঢাকা দপ্তরের আবাসন পুল এখন সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে শত শত সৎ ও জ্যেষ্ঠ কর্মচারী তাঁদের প্রাপ্য আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অভিযোগে সফিকুর রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের বিষয়টিকেও সামনে আনা হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে তৎকালীন এক মন্ত্রীর সুপারিশপত্রের (ডিও লেটার) মাধ্যমে নিজেকে ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী পরিচয় দিয়ে তিনি ঢাকা বিভাগের ডিআরএম পদটি বাগিয়ে নেন। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি রাতারাতি অবস্থান বদলে বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রেলওয়ের ভুক্তভোগী কর্মচারীরা জানান, অধস্তন কোনো কর্মচারী সামান্য অপরাধ করলেও কালবিলম্ব না করে ব্যবস্থা নেয় প্রশাসন। কিন্তু একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ দেওয়ার পরও টানা ২২ মাস ধরে কর্তৃপক্ষের নীরবতা অনভিপ্রেত।
কর্মচারীরা অবিলম্বে বিতর্কিত 'সিএস/১৪/এইচ' ও 'সিএস/১৪/ই' কোয়ার্টারের অবৈধ বরাদ্দ বাতিলসহ একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নথি গায়েবের ঘটনায় দণ্ডবিধির ২০৪ (প্রমাণ লোপাট) ও ৩৮১ (চুরি) ধারায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তাঁরা।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক ডিআরএম ও বর্তমান সিওপিএস (পূর্ব) সফিকুর রহমানের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তাও গণমাধ্যমের কাছে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
Comments