June 28, 2017, 7:47 am | ২৮শে জুন, ২০১৭ ইং,বুধবার, সকাল ৭:৪৭

একবার বিদায় দে মা…

Khudiramসানজিদা সামরিন: ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি/হাসি হাসি পরবো ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী/কলের বোমা তৈরি করে/দাঁড়িয়ে ছিলেম রাস্তার ধারে মাগো/বড়লাটকে মারতে গিয়ে মারলাম আরেক ইংল্যান্ডবাসী।’

পীতাম্বর দাসের লেখা এ গানটি অনেকটাই বলে দেয় বিপ্লবী ক্ষুদিরাম দাসের স্বরূপ। ফাঁসির মঞ্চে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে টগবগে এক যুবক। কী এমন বয়স তার, মাত্র ১৮ বছর। পরনে সাদা ধুতি। শ্যামলা ছিপছিপে গড়ন, কোঁকড়া চুল ভাগ হয়ে পড়ে রয়েছে সিঁথির দু’পাশে।

মৃত্যু হাত বাড়িয়ে ডাকছে তাকে। সময় নেই আর একটুকুও। ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে সেই মুহূর্তে তরুণটি বলে উঠলো, ভালো বোমা বানাতে পারি আমি, মৃত্যুর আগে সারা ভারতবাসীকে তা শিখিয়ে দিতে চাই।

ফাঁসির মঞ্চে  জীবনের শেষ ইচ্ছের কথা এভ‍াবেই জানিয়েছিলেন বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু। আজ সেই ১১ আগস্ট। ১৯০৮ সালের এই দিনে ফাঁসির মঞ্চে শহীদ হন এই বিপ্লবী।


বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন ক্ষুদিরাম। ১৯০৪ সালে মেদিনীপুরে কলেজিয়েট স্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। ছিলেন রাজনৈতিক দলের সদস্য। অল্প বয়স হওয়া স্বত্ত্বেও কম সময়েই দলটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯০৫ সালে শিক্ষক সত্যেন বসুর নেতৃত্বে একটি গুপ্ত সংগঠনে যোগ দেন ও ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এ আন্দোলনে ব্রিটিশদের তৈরি পণ্য ও আমদানি করা দ্রব্য ভারতে এলে তিনি সেগুলো ধ্বংস করেন ও পুড়িয়ে দেন। রাজদ্রোহমূলক কাজে জড়িত থাকায় ১৯০৬ সালে পুলিশের হাতে পড়তে পড়তেও বেঁচে যান ক্ষুদিরাম। এসময় বিদ্রোহী বিপ্লবীদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা নেন কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড।

ভারতীয় বিপ্লবীরা দ্বিগুণ উত্তেজনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন কিংসফোর্ডের প্রতি। এবার তাকে ধ্বংস করতে হবে। আর এর দায়িত্ব পড়ে দলের দুরন্ত ছেলেটির ওপর। এসময় ক্ষুদিরাম ও তার সহযোগী প্রফুল্ল চাকী কিংসফোর্ডের গতিবিধি ও চলাফেরা লক্ষ্য রাখতেন। বিহারে মজফ্ফরপুরে স্টেশন জাজ হয়ে বদলি হওয়া কিংসফোর্ডের নিজ বাসভবনের পাশেই ছিল ইউরোপিয়ান ক্লাব।


১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল সেখানেই কিংসফোর্ডের জন্য আড়ালে অপেক্ষা করছিলেন তারা। কিন্তু কিংসফোর্ডের গাড়ি ভেবে ভুলবশত তারা অন্য একটি গাড়িতে বোমা ছোড়েন। সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলেই মারা যান দুই ব্রিটিশ নাগরিক। এবার আর পালিয়ে বাঁচা গেলো না। পরদিন সকালে ওয়াইসি রেলস্টেশনে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন ক্ষুদিরাম। হত্যার দায়ে ওই বছর ২১ মে তার বিচার শুরু হয়। আলিপুর বোমা মামলা নামে পরিচিত এই বিচারে বিচারক ছিলেন  ব্রিটিশ মি. কর্নডফ, লাথুনিপ্রসাদ ও জানকিপ্রসাদ। মামলার রায়ে ক্ষুদিরামকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

রায় শোনার পর ক্ষুদিরাম হাসছেন। উজ্জ্বল চেখেও হাসির রেশ। তার হাসিমুখ দেখে বিচারকরা দ্বিধায় পড়লেন। দ্বন্দ্ব ছিলো এটাই, এই যুবক কী জানে ফাঁসির মানে কী! সে কী ফাঁসির মঞ্চকে রঙ্গমঞ্চ ভাবছে!

১১ আগস্ট ভোর ছয়টা। কারাগারের বাইরে আকাশ কাঁপিয়ে শত শত কণ্ঠধ্বনি ফুঁড়ে বাতাস ভারী হচ্ছে বন্দে মাতরম ধ্বনিতে। অতঃপর সময় ঘনিয়ে এলো তার। ফাঁসির ঠিক এক মুহূর্ত আগেও ক্ষুদিরামের ঠোঁটে ছিল সেই গৌরবের হাসি।

ঢাকা জার্নাল, আগস্ট ১১, ২০১৫

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *



এই পাতার আরো খবর -

জার্নাল