June 28, 2017, 11:36 am | ২৮শে জুন, ২০১৭ ইং,বুধবার, সকাল ১১:৩৬

এ দেশে নীতির কোন দাম নেই: ব্লগার’র স্ত্রী

Blogger-arrested-bg20130402034748ঢাকা জার্নাল: গোয়েন্দা পুলিশের তলব পেয়ে ব্লগার স্বামী গিয়েছিলেন দেখা করতে৷ কিন্তু রাতে আর ফেরেননি তিনি৷ রাতভর জেগে থেকে সকালে গেছেন গোয়েন্দা কার্যালয়ে, বিকেলে আদালতে৷ ইচ্ছা ছিল, স্বামীকে নিয়ে ঘরে ফিরবেন৷ হলো না৷

ঢাকায় তিন ব্লগার গ্রেপ্তারের খবর এখন সবার জানা৷ এদেরই একজন মশিউর রহমান বিপ্লব৷ এক কন্যা এবং স্ত্রী ড. সানজিদা পারভীনকে নিয়ে সংসার তাঁর৷ সোমবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের বার্তা পেয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করতে যান তিনি৷ ব্লগার রাজীব হত্যাকাণ্ডের পর এরকম আরো কয়েকবার গোয়েন্দা কার্যালয়ে গিয়েছেন তিনি৷ সেটা রাজীবের খুনিদের বিচারে সহায়তার জন্য৷ স্ত্রী সানজিদা পারভীনের তাই ভাবনার কোনো কারণ ছিল না৷

কিন্তু রাতের দিকে বদলে গেল পরিস্থিতি৷ কথা বলার জন্য ডেকে নিয়ে বিপ্লবকে আটক করে গোয়েন্দারা৷ রাতের বেলা তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়া হয়৷ ঘটনার আকস্মিকতায় দিশেহারা হয়ে পড়েন পারভীন৷ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার তাঁর স্বামী৷ অথচ তাঁকেই কিনা রাতারাতি গ্রেপ্তার করা হলো!

দুশ্চিন্তায় সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে সকালেই তিনি ছোটেন গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে৷ কিন্তু ততক্ষণে ‘ধর্মীয় উস্কানিমূলক’ লেখালেখির কথিত অভিযোগ উঠেছে তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে৷ বিপ্লবকে আরো দুই ব্লগারসহ সাধারণ অপরাধীর মতো হাজির করা হয়েছে গণমাধ্যমের সামনে৷ জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবিতে সংগ্রামরত স্বামীকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকারের মেয়াদকালে এভাবে দেখাটা কল্পনারও বাইরে ছিল পারভীনের৷

বেদনায় নীল পারভীন হার ছাড়েননি৷ ছুটেছেন আদালতে৷ স্বামীর জন্য জামিন আবেদন করেছেন৷ কিন্তু সেই আবেদন আমলে নেননি আদালত৷ বরং পুলিশের দশ দিনের রিমান্ড আবেদনের প্রেক্ষিতে ব্লগার সুব্রত অধিকারী শুভ, মশিউর রহমান বিপ্লব ও রাসেল পারভেজকে সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন৷

একদিনে এত ধকল সহ্য করা একজন নারীর পক্ষ সহজ নয়৷ কিন্তু পারভীন লড়ে যাচ্ছেন৷ কথা বলার সময় তাঁর কথা মাঝোমাঝেই আটকে যাচ্ছিল৷ ক্রন্দনরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি জানালেন, আদালত থেকে এইমাত্র ফিরলাম৷ এখন মশিউরের জন্য জামাকাপড় নিয়ে যেতে হবে৷ ওকে আরো সাতদিন আটকে রাখবে৷

বিপ্লবদের আটকের খবরে গোটা ব্লগ সম্প্রদায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে৷ তাঁদের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ব্লগাররা৷ একটি ব্লগ সাইট নিজেদের সকল কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিয়েছে প্রতিবাদের অংশ হিসেবে৷

পারভীন নিজেও ব্লগার৷ স্বামীর লেখালেখির খবর তিনি ভালোই রাখেন৷ অকপটে জানালেন, তাঁর স্বামী ধর্মে বিশ্বাস করেন না৷ কিন্তু তাই বলে তিনি কখনো কাউকে গালি দেননি৷ কখনো ধর্মীয় কটুক্তি করে কোন মন্তব্যও করেননি৷ বরং সবসময় নিয়ন্ত্রিত কথাবার্তা বলেছেন৷

পারভীন মনে করেন, তাঁর স্বামীকে ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ এবং এই গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে খুব নিরীহ ধরনের তিনজনকে বেছে নেওয়া হয়েছে৷ তিনি বলেন, ‘খুব নিরীহ তিনজন মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ যারা একেবারে ছাপোষা, কিছু করতে পারবে না৷’

গত কয়েক বছর ধরে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবিতে লেখালেখির পর স্বামীর এই পরিণতি কিছুতেই মানতে পারছেন না পারভীন৷ তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বললেন, ‘‘বাংলাদেশ থাকবে রাজাকার মুক্ত – এই অবস্থান থেকে আমরা গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করছি৷ এখন এই অবস্থানে থাকার পরও যদি (বর্তমান সরকারের আমলে) আমাদের জেল খাটতে হয়, সেটা খুবই দুঃখজনক৷ তাহলে তো শিবির করলেই ভালো ছিল৷”

পারভীন মনে করেন, ‘বাংলাদেশে নীতির কোনো দাম নেই৷’ দাম থাকলে আজ বিপ্লবদের মতো ব্লগাররা হেনস্থার শিকার হতেন না৷ জেল খাটতেন না৷ এতকিছুর পরও পারভীনের চাওয়াটা সীমিত৷ শুধু চান, বিপ্লবকে সসম্মানে ছেড়ে দেওয়া হোক৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *



এই পাতার আরো খবর -

জার্নাল