June 24, 2017, 1:04 pm | ২৪শে জুন, ২০১৭ ইং,শনিবার, দুপুর ১:০৪

স্মার্টফোন-ট্যাবে ভয়াবহ ঝুঁকিতে শিশুরা!

ঢাকা জার্নাল: প্রযুক্তি-প্রজন্মের শিশুদের কাছে স্মার্টফোন-ট্যাবলেটসহ ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো দারুণ জনপ্রিয়। এসব ডিভাইসে তারা কখনো খেলছে গেমস, কখনো করছে ইন্টারনেট ব্রাউজিং।

‘প্রযুক্তির সঙ্গে এগিয়ে যেতে সন্তানের আগ্রহ’ দেখে দেখে বাবা-মাও এসব ডিভাইস খুশি মনে কিনে দিচ্ছেন। তারা মনে করছেন, এসব ডিভাইসে সন্তানদের যেমন ‘ভালো‘ সময় কাটছে, তেমনি তাদের ‘মানসিক উন্নতি’ও হচ্ছে।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে পুরোপুরি দ্বিমত। কেবল দ্বিমতই নন, তারা এসব ডিভাইসকে রীতিমত ‘মরণাস্ত্র’ বলছেন। তারা বলছেন, এই ডিভাইস শিশুদের ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক বাবা-মা তাদের ৩-৪ বছর বয়সী শিশু-সন্তানের হাতে স্মার্টফোন-ট্যাব বা এ জাতীয় হ্যান্ডহেল্ড গেমস খেলার ডিভাইস তুলে দিচ্ছেন। ফলে শিশুরা অধিকাংশ সময় ব্যয় করছে ডিভাইসগুলোর পেছনে। এতে তাদের ভেঙে যাচ্ছে মেরুদণ্ড, পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পিঠ-ঘাড়-চোখ। সেইসঙ্গে মানসিকতাও।

তাদের মতে, ছোট অবস্থায়ই শিশুদের এসব সমস্যায় পড়তে দেখা যায়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা হয়ে ওঠে আরও স্পষ্ট।

চার বছর বয়সী আদিবের মোবাইলফোনে গেমসপ্রীতি অনেক দিনের। সে দিনের অনেকটা সময় এই গেমস খেলে পার করে। তার বয়স যখন আট মাস, তখন থেকেই সে পরিচিত হয় অনলাইন দুনিয়ার সঙ্গে। সেখানে কার্টুন দেখার পাশাপাশি ছড়াও পড়তো সে। কিন্তু একটা সময় তার বাবা-মা দেখতে পেলেন, ছেলের চোখ দিয়ে কারণে-অকারণে পানি ঝরছে। আর মাথা-ব্যথা তো লেগেই রয়েছে। তারা শরণাপন্ন হলেন চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসক জানালেন, স্মার্টফোনে অতিরিক্ত আসক্তির কারণে আদিবের মাথা-ব্যথা ও চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। ডাক্তার তার জন্য আইড্রপসহ ওষুধ দিলেন। কিন্তু চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ কোনো কাজে এলো না। এখন তার মা প্রয়োজন ছাড়া তাকে মোবাইল ব্যবহার করতে দেন না।

কেস স্টাডি ২
বিধির বয়স এখন চার বছর। চার মাস বয়সে বাবা তাকে একটি ট্যাব কিনে দেন। মা অবশ্য এতে আপত্তি করেননি। কারণ, বিধির আশপাশে তার কোনো খেলার সঙ্গী ছিল না। তাই সে দিনের প্রায় আট ঘণ্টা সময়ই ব্যয় করতো এই ট্যাবের পেছনে। কিন্তু একটা সময় এই ট্যাবের কারণে তার পিঠে-ঘাড়ে গুরুতর ব্যথা শুরু হলো। এর কারণে সে পিছিয়ে পড়তে শুরু করলো পড়াশোনা থেকে।

ইলেকট্রনিক ডিভাইসের টানা ব্যবহারের এ ধরনের সর্বনাশা পরিণতির বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, বর্তমান সময়ে শিশুদের মাথা ব্যথা, ঘাড় ব্যাথা, হাতের মাংসপেশীর সঙ্গে সঙ্গে পিঠে ব্যথাও বেড়ে গেছে। আর এসব সমস্যার অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি কারণ হলো অতিরিক্তমাত্রায় ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার। শিশুরা এসব ডিভাইস দিনের অধিকাংশ সময় ব্যবহার করছে। কখনও বসে, আবার কখনো দাঁড়িয়ে ঝুঁকে। শিশুরা যখন বাঁকা হয়ে বসে বেশি সময় ধরে এসব ডিভাইস ব্যবহার করছে, তখন তাদের মেরুদণ্ড ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের চোখ ও হাতের আঙুলও। আর ঘরকুনো হওয়ায় তারা হয়ে উঠছে হিংস্র প্রকৃতির, পাচ্ছে না পর্যাপ্ত ভিটামিন ও ক্যালসিয়ামও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ডিভাইস আসক্ত হযে ব্যবহারের ফলে শিশুরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয় তা হলো-

পিঠে ও মেরুদণ্ডে ব্যথা
সবসময় ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের ফলে শিশুরা মাসকিউলসকেলেটাল জটিলতায় পড়ছে। এটি এমন এক অসুখ যাতে আক্রান্ত হলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, ঘাড় ও পিঠের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সহযোগিতাকারী সন্ধি, বন্ধনী, পেশী, স্নায়ু ও রগে জ্বালাপোড়া ও ব্যথা শুরু হয়।। শিশুদের পিঠ ও মেরুদণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভীষণভাবে।

মানসিকতা
গেমস ডিভাইসে আসক্তি শিশুদের মন-মানসিকতায় বিরূপ পরিবর্তন আনছে। এসবে আবিষ্ট থাকার কারণে তাদের মনোযোগ সরে যাচ্ছে। শারীরিক বৃদ্ধির পাশাপাশি কমে যাচ্ছে সামাজিক কর্মকাণ্ডও।

ঘুম
অতিরিক্ত মাত্রায় এসব ডিভাইস ব্যবহারের ফলে প্রভাব পড়ছে তাদের ঘুমে। কারণ অধিকাংশ  সময় এসবের পেছনে ব্যয় করার ফলে তাদের পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে না। যার ফলে তারা হাইপারঅ্যাক্টিভিটি জটিলতায় ভোগে। হাইপারঅ্যাক্টিভিটি হলো মনোযোগের অতিরিক্ত ঘাটতিজনিত চঞ্চলতা, যা কোনো চিন্তা ছাড়াই কোনো একটি কাজ বারণ সত্ত্বেও শিশুদের বারবার করতে ইচ্ছা করে।

চোখ
ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি মাত্রাতিরিক্তি প্রীতি শিশুদের চোখের সমস্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে শিশুরা চোখে ঝাপসা দেখাসহ রেডনেস, ড্রাই আই সিনড্রোম ও হেস্টেন নেয়ারসাইটনেস নামক এ জাতীয় রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

মেদবৃদ্ধি
শিশুরা সাধারণত শুয়ে বা বসে এসব ডিভাইস ব্যবহার করে। এর ফলে বেড়ে যাচ্ছে তাদের ওজন, যা তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করছে।

কীভাবে এসব ডিভাইস থেকে দূরে রাখা যায় শিশুদের-

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রত্যেক মা-বাবার উচিত শিশুদের ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের অযথা  ব্যবহারে অনুৎসাহিত করা। একইসঙ্গে শারীরিক পরিশ্রম হয় এমন কাজের পাশাপাশি তাদের গঠনমূলক কাজে উৎসাহিত করা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টার বেশি কোনো ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়।

এমনকি শিশুরা যখন পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে শুরু করে তখনও তাদের ‘সারপ্রাইজ’ দিতে এ ধরনের ডিভাইস না দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা জার্নাল, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৫

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *



এই পাতার আরো খবর -

জার্নাল