স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের বিভিন্ন স্তরের মতামত নিচ্ছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব

জানুয়ারি ২৩, ২০২৪

আসন্ন উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের বিভিন্ন স্তরের মতামত নিচ্ছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। এরইমধ্যে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে দলের স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের একটি লিখিত প্রস্তাবনাও জমা হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও প্রভাবশালী দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আগামী মার্চে সারা দেশে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা জানানো হয়েছে।

আগামী ৯ মার্চ ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচন হবে। একই দিনে কয়েকটি পৌরসভায় নির্বাচনও রয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, পরে আনুষ্ঠানিকভাবে তফসিল ঘোষণা করা হবে।

বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কিনা, এ নিয়ে বিএনপিতে আলোচনা শুরু হয়েছে।

কোনও কোনও নেতা মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত। এতে সংগঠন শক্তিশালী হয়, তৃণমূলে দায়িত্বশীল ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব মেলে এবং দলে আস্থাশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

কারও কারও যুক্তি, এই সরকারের বিরুদ্ধে পদত্যাগের একদফা আন্দোলন চলাকালীন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যাওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক কৌশলগত দিক থেকে পিছিয়ে পড়বে বিএনপি। একইসঙ্গে এই মুহূর্তে বিএনপির সঙ্গে সরকার পদত্যাগের যুগপৎ আন্দোলনে যারা যুক্ত, তারাও নেতিবাচক অবস্থান নিতে পারে।

দলের স্থায়ী কমিটির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে মতামত নিতে শুরু করেছেন তারেক রহমান। এরমধ্যে দলের একাধিক বিশেষজ্ঞ একটি প্রস্তাবনাও জমা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘এখনও নির্বাচন নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়নি। আর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে প্রস্তাব জমা হয়েছে কিনা, জানা নেই।’

বিএনপির ঘনিষ্ঠ কোনও কোনও দায়িত্বশীল দাবি করেছেন, আদতে কেন্দ্রীয় নেতাদের অনীহাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বলয়, কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা—যারা পরবর্তী নেতৃত্ব সৃষ্টিতে অনীহা রাখেন এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাব হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় রয়েছেন, এমন নেতাদের অনেকে নির্বাচনের প্রতি আগ্রহী নন। ‘বিকল্প নেতা’ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাকে তারা সামনে আনতে বরাবরই বাধা সৃষ্টি করেন।

দলের বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ করে জানা গেছে, বিগত কয়েকটি সিটি নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের দিকে নজর দিলেই তা স্পষ্ট হবে। নিশ্চিত বিজয়ী প্রার্থীদের ‘কৌশলগত কারণ’ দেখিয়ে বসিয়ে রাখা হয়। আর এর পেছনে ভূমিকা রেখেছেন ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলয়ের’ দায়িত্বশীলরা।

প্রসঙ্গত, ২০২৮ সালের অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। পরবর্তী অন্য কোনও নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। ২০২২ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণে বহিষ্কৃত হন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) দুইবারের নির্বাচিত মেয়র মনিরুল হক সাক্কু। বিদায়ী বছরে অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নিশ্চিত বিজয়ের পরিবেশ থাকলেও দলের সিদ্ধান্তের কারণে অংশ নেননি সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।

গত বছরের ২২ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকেও এ বিষয়টি উঠে এসেছিল। বৈঠকে উপস্থিত কারও কারও দেওয়া তথ্য—ওই বৈঠকে বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আঞ্চলিক প্রভাব ও কৌশল তুলে ধরেন।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, ২০১৪ সালের পর ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির স্থানীয় নেতারা অংশগ্রহণ করেছিলেন। ২০১৮ সালের পর স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে প্রথম দিকে অংশ নিয়েছিল বিএনপি।

তবে ২০২১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—২৮ ফেব্রুয়ারি গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের অফিসে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা আর কাউকে মনোনয়ন দেবো না’, বলে উল্লেখ করেন শায়রুল কবির খান।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জানান, ‘বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে তো মানে না বিএনপি। সেক্ষেত্রে দলীয়ভাবে অংশগ্রহণের কোনও প্রশ্নই আসে না।’

তিনি উল্লেখ করেন, যেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সেক্ষেত্রে আগ্রহী হবে অনেকেই। আমরা ডিসকারেজ করতে পারি, কিন্তু বাধা তো দিতে পারি না। হয়তো বহিষ্কার করা হবে না। মার্কা ছাড়া অনেকে প্রার্থিতা করতে পারে। তবে এটা ঠিক, আওয়ামী লীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই বিএনপির লোকদের জিততে দেবে না।

ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

বিএনপির কোনও কোনও নেতা মনে করেন, বিএনপি যদি নির্বাচনে আসে, সে বিষয়টিকে সামনে রেখেই ক্ষমতাসীনরা প্রার্থিতার বিষয়টি উন্মুক্ত রাখতে চায়। যে কারণে দলীয় প্রতীকে মনোনয়ন দেবে না।

চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সদস্য জয়নাল আবেদীন ফারুক মঙ্গলবার (২৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ তো নৌকা দেবে না, তাদের নৌকা ডুবে গেছে। তারা তো সাত জানুয়ারির মতো ডামি নির্বাচন করবে। এই সরকারের অধীনে তো আমরা বিগত নির্বাচনে যাইনি। জাতীয় নির্বাচনেও যাইনি। কারণ, নির্বাচন কমিশন তো পুরোপুরি সরকারের তল্পিবাহক। তাদের কাছে কোনও অভিযোগ দিলেও লাভ নেই।’