সর্বজনীন পেনশন কেন প্রয়োজন?

জুলাই ৭, ২০২৪
মোঃ রুপাল মিয়া

মোঃ রুপাল মিয়া : 

জন্মের পর থেকে অর্থ উপার্জনের আগ পর্যন্ত মানুষের জীবন থাকে নির্ভার। এরপর ধীরে ধীরে অর্থ আয়-ব্যয় ও সঞ্চয়ের বিষয়গুলো মাথায় আসে। একজন মানুষ যতদিন কর্মক্ষম থাকেন ততদিন আয়-ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে জীবনযাপন করার চেষ্টা করেন। আবার অনেকেই উপার্জিত আয়ের কিছু অংশ ভবিষ্যতের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সঞ্চয় করে থাকেন। এটাই হলো মানুষের জীবনের বাস্তব চিত্র। কিন্তু বয়সের ভারে মানুষ একসময় কর্মহীন হয়ে পড়েন। এই কর্মহীন অবস্থায় মানুষ সবচেয়ে বেশি অসহায়ত্বের শিকার হন। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে বয়স্ক লোকের জন্য যে পারিবারিক নিরাপত্তা বলয় ছিল তা ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বয়স্ক মানুষের নিরাপত্তা দিন দিন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। দেশের বয়স্ক মানুষের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সরকার সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছে। একজন নাগরিক কেন সর্বজনীন পেনশন স্কিমে সংযুক্ত হবেন, তার যৌক্তিক কারণও রয়েছে।

সর্বজনীন পেনশন স্কিমে জমা করা অর্থ সম্পূর্ণ নিরাপদ। কারণ জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হওয়ায় পেনশন স্কিমে জমা করা অর্থের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি রয়েছে। ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে আজীবন পেনশন পাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্ত সর্বজনীন পেনশন স্কিমে চাঁদা প্রদান করলে আজীবন পেনশন পাওয়া যাবে। পেনশন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী জমা করা টাকা থেকে যতটা লাভবান হতে পারবেন অন্য কোনো ব্যবস্থায় জমা করা টাকা থেকে ততটা লাভবান হতে পারবেন না।

সমতা স্কিমে যে-কোনো স্বল্প আয়ের মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এই স্কিমে অংশগ্রহণকারী ৫০ শতাংশ চাঁদা এবং বাকি ৫০ শতাংশ চাঁদা সরকার প্রদান করবে। অংশগ্রহণকারী মাসিক ৫০০ টাকা (সরকারি অংশসহ এক হাজার টাকা) করে চাঁদা প্রদান করলে দশ বছরে মোট ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জমা হবে। তিনি মাসিক পেনশন পাবেন এক হাজার ৫৩০ টাকা। পেনশন বিধি অনুযায়ী, ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর চাঁদা প্রদানকারী মারা গেলেও তাঁর নমিনি ১৫ বছর মাসিক পেনশন পাবেন। এই হিসাবে ১৫ বছরে মোট পেনশনের পরিমাণ হবে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪০০ টাকা। যা জমাকৃত টাকার ২.২৯ গুণ। অন্যান্য স্কিমের ক্ষেত্রেও এই হিসাব প্রযোজ্য। এভাবে পেনশন বিধি মোতাবেক ১৫ বছরে জমা করা টাকার ২.৮৯ গুণ,২০ বছরে জমা টাকার ৩.৬৯ গুণ, ২৫ বছরে জমা টাকার ৪.৭৭ গুণ, ৩০ বছরে জমা টাকার ৬.২৩ গুণ, ৩৫ বছরে জমা টাকার ৮.২২ গুণ, ৪০ বছরের জমা টাকার ১০.৯৫ গুণ এবং ৪২ বছরে জমা টাকার ১২.৩০ গুণ টাকা পাওয়া যাবে। চাঁদা প্রদানকারী যদি ৭৫ বছরের অধিক সময় বেঁচে থাকেন তাহলে এই টাকার পরিমাণ আরও বেশি হবে।

বেসরকারি কর্মচারীরা প্রগতি স্কিমে অংশ নিতে পারবেন। এক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ চাঁদা কর্মচারী ও অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ চাঁদা প্রতিষ্ঠান প্রদান করবে। এক্ষেত্রে ন্যূনতম চাঁদার পরিমাণ এক হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ চাঁদার পরিমাণ পাঁচ হাজার টাকা। তবে প্রতিষ্ঠানের বাইরে নিজ উদ্যোগে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বেসরকারি কর্মচারীদের।

স্বকর্মে নিয়োজিতদের (কৃষক, রিকশাচালক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতিসহ সকল অনানুষ্ঠানিক কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি) জন্য রয়েছে সুরক্ষা স্কিম। ন্যূনতম এক হাজার টাকা চাঁদা প্রদানের মাধ্যমে স্বকর্মে নিয়োজিতরা এই স্কিমে অংশ নিতে পারবেন। এই স্কিমে সর্বোচ্চ চাঁদার পরিমাণ পাঁচ হাজার টাকা।

প্রবাসী বাংলাদেশীরা ন্যূনতম পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা প্রদানের মাধ্যমে প্রবাস স্কিমে অংশ নিতে পারবেন। প্রবাস হতে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর সমপরিমাণ অর্থ দেশীয় মুদ্রায় পরিশোধ করাসহ প্রয়োজনে স্কিম পরিবর্তন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চাঁদার পরিমাণ ১০ হাজার টাকা।

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় প্রাথমিক পর্যায়ে চারটি (প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা) স্কিম চালু ছিল। পরবর্তী সময় বিধিমালা সংশোধন করে স্বশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ‘প্রত্যয়’ নামে আরও একটি স্কিম চালু করা হয়। এটি ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। প্রত্যয় স্কিমে অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের মূল বেতনের ১০ শতাংশ বা সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা প্রদান করতে পারবেন। আর সমপরিমাণ অর্থ প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা প্রদান করবে।

সকল স্কিমের ক্ষেত্রে চাঁদাদাতা তার জমা অর্থের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ঋণ হিসাবে উত্তোলন করতে পারবেন। পেনশনের জন্য নির্ধারিত চাঁদা বিনিয়োগ হিসাবে গণ্য হবে এবং মাসিক পেনশন বাবদ প্রাপ্ত অর্থ আয়কর মুক্ত থাকবে।

সর্বশেষ জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সি মানুষের সংখ্যা ৬২ শতাংশ। আর ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা এক কোটিরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৫ থেকে ২০ বছর পর বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা তিন কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এর ফলে বাংলাদেশে কর্মহীন লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এসব কর্মহীন লোকের অধিকাংশরই সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো নাগরিকের বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত বা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতির কারণে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার রয়েছে। সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা থেকে হোক বা বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তার কথা ভেবেই হোক, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু নিঃসন্দেহে সরকারের একটি মহতী উদ্যোগ।

নাগরিকদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তাকে উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মাণের অন্যতম নিয়ামক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। উন্নয়নশীল দেশসমূহে নাগরিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সর্বজনীন পেনশনের ধারণা দিনদিন জনপ্রিয় হচ্ছে। এ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সর্বজনীন পেনশন স্কিম বয়স্ক নাগরিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি অধিকতর কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবে, যা ২০৪১ সালের উন্নত-স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। (পিআইডি ফিচার)

লেখক : সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রংপুর