কানেক্টিভিটি, কমার্স, কলাবোরেশন 

জুন ২৬, ২০২৪
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

 

দু’সপ্তাহের মধ্যে আবারও ভারত সফর করলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে দু’দিনের সফর শেষ করে ফিরেছেন শনিবার রাতে। এই সফরে ছিলাম সফরসঙ্গী হিসেবে। ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরেও তাঁর সাথে গিয়েছিলাম আমি, তবে একজন রিপোর্টার হিসেবে এবং আমার প্রতিষ্ঠান একুশে টেলিভিশন আমাকে পাঠিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর এসব সফরে অনেক সাংবাদিককেই নেওয়া হয়, আমাকে কখনও নেওয়া হয়নি, কেন হয়নি অন্য অনেকের মতো আমার কাছেও এটি এক বিস্ময়। কোন বিবেচনায় কে সংযুক্ত হয়, কে কী ভূমিকা রাখেন এসব সংযুক্তিতে সেই এক বড় রহস্য।

যাইহোক সফরেই আসি। নরেন্দ্র মোদি টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর এটিই ভারতে কোন সরকার প্রধানের প্রথম সফর। সফরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু শনিবার নয়া দিল্লিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে। সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্বর্ধনা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দো মোদি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গার্ড পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী যখন একাই গার্ড অব অনার নিচ্ছিলেন তাঁর ঋজু ভঙ্গিতে দৃপ্ত পায়ে হাঁটা মনোমুগ্ধকর ছিল আমাদের সবার কাছে।

এগুলো সবই আনুষ্ঠানিকতা। সফরের আসল গুরুত্ব ছিল নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসের বৈঠকে। এখানে দুই প্রধানমন্ত্রী একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর শেষে যৌথ বিবৃতি পড়েন সাংবাদিকদের সামনে।

আমাদের দেশে একটি বড় জিজ্ঞাসা আছে সফর থেকে কী পাওয়া গেল বা প্রধানমন্ত্রী কী নিয়ে এলেন? ভাবটা এমন যে এটি একটি বাজার সদাই করার সফর এবং লাগেজ ভর্তি করে প্রাপ্তি নিয়ে আসতে হবে। অনেকেই বলাবলি করছিলেন যে, নরেন্দ্র মোদির এবার সরকার সরকার একটি দুর্বল সরকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ আরও শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে সরকার গঠন করেছে। তাই দ্বিপক্ষীয় অমীংমাংসিত বিষয়গুলো আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুযোগ বেশি।

নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশী অতিথিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন

কিন্তু কূটনীতি আর দেশের সাথে দেশের সম্পর্ক এভাবে চলে না। একটা কথা প্রায়ই বলা হয় যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নরেন্দ্র মোদি দুই দেশের সম্পর্ক-কে অন্য উঁচুতে নিয়ে গেছেন। এখন সম্পর্কের বিস্তার ঘটাতে হবে নানাস্তরে। হায়দরাবাদ হাউসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় আলোচনা সংক্রান্ত যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বললেন, ‘‘ভারত আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং বিশ্বস্ত বন্ধু।’ সেই জায়গা থেকেই বাংলাদেশ চায় দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূকৌশল এবং ভূ-অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার করতে ভারতের আরও কিছু নতুন পদক্ষেপ নিক। বেশ কিছু উদ্বেগের জায়গা দূর হয়েছে। কিন্তু দু’দেশের মধ্যে যে সুস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাকে ধরে রাখতে তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা জরুরি।

মেডিক্যাল ই-ভিসা চালুর প্রতিশ্রুতি চিকিৎসার জন্য ভারত যাওয়া বাংলাদেশিদের জন্য বড় স্বস্তি। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এখনও ‘কাঁটা’ তিস্তার পানিবন্টন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতেই ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ওই চুক্তি এখনও পর্যন্ত স্বাক্ষরিত হয়নি যদিও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এই চুক্তি লোক সভায় পাস করেছে। এবার নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছেন, বাংলাদেশে তিস্তার পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করতে একটি কারিগরি দল শিগগিরই বাংলাদেশ সফর করবে। সিদ্ধান্ত হয়েছে,১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির পুর্ননবীকরণের জন্য টেকনিক্যাল স্তরে আলোচনা শুরু করবে দুই দেশ। আগামী মাসেই চিন যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। বেইজিং তিস্তা মহাপ্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করতে চায় এবং সেটি যে নয়া দিল্লির জন্য একটি মাথাব্যথা সেটা কূটনৈতিক স্তরের আলোচনায় আছে। দুই দেশের মধ্যে প্রবাহিত অভিন্ন নদীগুলোর পানিবন্টন ও ব্যবস্থাপনা বরাবরের মতো আলোচনায় উঠে এসেছে বলেই জানা গেছে।

‘বাংলাদেশ আমাদের বৃহত্তম উন্নয়ন-সঙ্গী, তাদের স্বার্থকে ভারত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়’, এমন বক্তব্য দিয়ে নরেন্দ্র মোদি অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, প্রতিরক্ষা, রেল যোগাযোগ এবং পরমাণু গবেষণার ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে বলে জানান। জানিয়েছেন ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়েছে ‘সবুজ অংশীদারি’ নিয়েও। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ডে আঞ্চলিক আর্থ-সামাজিক পরিসরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবার। ভারত মহাসাগর অঞ্চলের জন্য ইন্দো-প্যাসিফিক এশন্স ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশের যোগদানকে স্বাগত জানিয়েছে ভারত। সমূদ্র অঞ্চলে ব্লু-ইকোনোমি নিয়ে কাজ করতে সমঝোতা স্বাক্ষর নতুন নতুন ক্ষেত্রে দুই দেশের সক্রিয়তার আভাস দেয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নরেন্দ্র মোদি উভয়েই জানেন, সম্পর্কে উষ্ণতা থাকলে সব সঙ্কটই পার হওয়া যায়। মোদি বলতে ভুলেননি যে, এই উপমহাদেশে বাংলাদেশের তুল্য বড় বন্ধু তার আর নেই। বলেছেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার সঙ্গে গত দেড় দশকের সোনালি অধ্যায় ভারতকে প্রত্যয় জুগিয়েছে। ‘প্রতিবেশীই প্রথম’ এই কথাটি মোদি বেশ কয়েকবারই উচ্চারণ করেছেন বলেছেন, দু’দেশের সম্পর্কের ভিত্তি ‘কানেক্টিভিটি, কমার্স এবং কলাবোরেশন’। বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রফতানির ক্ষেত্রে ভারত আরও বড় গন্তব্য হয়ে কেন হয়ে উঠছে না সে প্রশ্ন এলে বলতে হবে যে দুই দেশ কতখানি বাস্তববাদিতার সঙ্গে সুযোগের ব্যবহার করতে পারছে।

অনেকেই প্রশ্ন তুলবে, রাজনৈতিক জায়গা থেকে সমালোচনা করবে যে, কোন কিছুই তো পেলাম না। আসলে এক সফরে সব সমস্যা চুকে যাবে,এটা কখনোই বলা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে কথাটি সবসময় বলেন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ যে বন্ধুত্বের বাতাবরণটিই বড় কথা, সঙ্কটের মুক্তি তাতেই ঘটতে পারে,ধীরে ধীরে।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, ঢাকা জার্নাল