June 23, 2017, 2:40 am | ২২শে জুন, ২০১৭ ইং,শুক্রবার, রাত ২:৪০

সামরিক শাসনামলে জারি করা কার্যকর অধ্যাদেশগুলোর আইনি ভিত্তি দিচ্ছে সরকার

এস এম আববাস, ঢাকা:211089_227049143975332_435638_n দেরীতে হলেও সামরিক শাসনামলে জারি করা কার্যকর অধ্যাদেশগুলোর আইনি ভিত্তি দিচ্ছে সরকার। এ সময়ে জারি করা ১৭২টি অধ্যাদেশের মধ্যে অকার্যকর কিছু অধ্যাদেশ বাদ দিয়ে এখনও কার্যকর এমন অধ্যাদেশগুলোর আইনি ভিত্তি দিতে দু’টি বিশেষ বিধান আইনের খসড়া নীতিগতভাবে ও চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

অতীতে অগণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারগুলোর আমলে এসব অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এসব অধ্যাদেশের বেশিরভাগই জারি করা হয় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের সময়।

এ বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বাংলানিউজকে বলেন, আইনগতভাবে বৈধতা দেওয়া অবশ্য করণীয় ছিল। কিন্তু অাশ্চার্য়ের ব্যপার অবশেষে সরকারের বোধদয় হয়েছে। আইনগুলো বাতিল হয়ে গেছে সেটা জানা ছিল। কিন্তু এতো দেরীতে কার্যকারিতা দেওয়া, আইনের ব্যাপারে সরকারের আরেকটা উদাসীনার নিদর্শন।”

সামরিক শাসনামলে জারি করা অধ্যাদেশের মধ্যে ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ৯১টি এবং ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর সময়ের ৮১টি অধ্যাদেশ রয়েছে ।

এসব অধ্যাদেশের মধ্যে এখনো যেগুলো কার্যকর আছে সেগুলোকে আইনি ভিত্তি দিতে সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিবে অনষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিশেষ বিধান আইনের দু’টি খসড়া মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করে সংসদ ও লেজিসলেটিভ বিভাগ।

বৈঠকে ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত জারিকৃত অধ্যাদেশ ‘কার্যকরণ (বিশেষ বিধান) আইন ২০১৩’ এবং ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর সময়ের মধ্যে জারিকৃত কতিপয় অধ্যাদেশ ‘কার্যকরণ (বিশেষ বিধান) আইন-২০১৩’র খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়।

বৈঠক শেষে সভাকক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইয়া বলেন, “এই দুই সময়ে যেসব অদ্যদেশ করা হয়েছে তা অবৈধ।ওই সময় নির্বাচিত জাতীয় সংসদ ছিলো না।তখন সামরিক শাসনের আওতায় অনেকগুলো অধ্যাদেশ ও আইন জারি করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যে রায় বলেছেন যে সামরিক সরকারটাই অবৈধ। রায়ে পঞ্চম সংশোধনী ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল হয়ে গেছে। তাই আইনের পরিভাষায় এগুলো শুরু থেকেই অকার্যকর।”

সচিব আরো বলেন, “১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ৯১টি এবং ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর ৮১টি অধ্যদেশ জারি করা হয়েছে। এগুলো অকার্যকর হয়ে গেছে। কিন্তু এগুলোর আওতায় যেসব কার্যক্রম গৃহিত হয়েছে, এগুলোকে একটি আইনী ভিত্তি দেওয়া দরকার। প্রজাতন্ত্রের কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে।”

সচিব জানান, দু’টি আইন করা হচ্ছে। ওই সময়ে যেগুলো আইন করা হয়েছে এবং কার্যক্রম রয়েছে সেগুলোকে আইনী সজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। এগুলোর অধ্যাদেশ জারি করা হবে। পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদে উঠানো হবে। যেগুলোর কার্যকারিতা ও প্রয়োজন রয়েছে সেগুলো নতুন করে আইন হবে। প্রয়োজনে এগুলো সংশোধনও করা হবে। পার্লামেন্টের আগামী অধিবেশনেই এই অধ্যাদেশগুলো আইন আকারে পাস হবে।

পঞ্চম সংশোধনী
পঞ্চম সংশোধনীতে সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের ১৮ অনুচ্ছেদ সংবিধানকে হেয় করা হয়েছে। এ তফসিলে ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলী সম্পর্কে কতিপয় ফরমান বৈধকরণ করা হয়। সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সব ফরমান অনুমোদন ও সমর্থন করা হয়। এ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ওই সময় নেয়া সব সামরিক ফরমান, বিধি-বিধান ও আইন সংবিধান সম্মতভাবে নেয়া হয়েছে এবং কোনো আদালতে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা যাবে না।

২০০০ সালে মুন সিনেমা হলের মালিকানা দাবির প্রেক্ষিতে দায়ের করা মামলায় ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগ সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে ২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই রায় বহাল রাখেন। প্রধান বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির বেঞ্চ ওই রায় দেন। পরবর্তীতে এই রায়ের আলোকেই সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে।

রায়ে বলা হয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট খন্দকার মোশতাকের রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ সংবিধান বহির্র্ভূত এবং বেআইনি। একইভাবে ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের কাছে খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা হস্তান্তরও অবৈধ। বিচারপতি সায়েমের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ এবং জিয়াউর রহমানকে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগও সংবিধান বহির্ভূত। তাদের সব ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগও অবৈধ।

সপ্তম সংশোধনী
১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর এ সংশোধনী পাস হয়। জেনারেল এইচএম এরশাদ তখন সরকার প্রধান। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তারিখে বিএনপি দলীয় সরকারের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এইচএম এরশাদ সামরিক আইন জারির মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন। জেনারেল এইচএম এরশাদ প্রথমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও পরে রাষ্ট্রপতি হন। এর পর তার সময়কালে বিভিন্ন অধ্যাদেশ জারি করেন।

এ সংশোধনীতে বলা হয় প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক যে সকল আদেশ, আইন ইত্যাদি জারি করেন সেগুলো বৈধভাবে প্রণীত হয়েছে বলে এবং তৎসম্পর্কে আদালত, ট্রইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।

এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদও সংশোধন করা হয়। এতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসর গ্রহণের বয়স ৬২ হতে ৬৫ তে উন্নীত করা হয়। ওই সংশোধনীতে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত এইচ এম এরশাদের শাসনামলের বৈধতা দেওয়া হয়েছিল।

এরশাদের শাসনামলে সামরিক আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সিদ্দিক আহমেদের করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে সপ্তম সংশোধনী বাতিল হয়। ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট সামরিক শাসক এরশাদের সকল আদেশ, আইন ও সামরিক বেসামরিক ফরমান ইত্যাদি বাতিল ঘোষণার রায় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও বিচারপতি নাঈমা হায়দার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ এ রায় দেন।

আপিল মামলায় ২০১১ সালের ১৫ মে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ সপ্তম সংশোধনী বাতিলে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রাখেন। প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে গঠিত ছয় সদস্যের বেঞ্চ এই রায় দেন।

পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করা এ রায়ের আলোকে পরববর্তীতে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *



এই পাতার আরো খবর -

জার্নাল