June 23, 2017, 2:38 am | ২২শে জুন, ২০১৭ ইং,শুক্রবার, রাত ২:৩৮

পিতৃপুরুষের পবিত্র মুখোশ

free-japanese-mask-wallpaper_422_84495ঢাকা জার্নাল: মার্কিন মুলুকের আদিম অধিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের পিতৃপুরুষের পবিত্র মুখোশ প্যারিসের একটি নিলামে বিক্রি করা যাবে কিনা, সে বিষয়ে রায় দিয়েছে এক ফরাসি আদালত৷ বুনিয়াদি প্রশ্নটা কিন্তু আদালতের এক্তিয়ার ছাড়িয়ে বহুদূর চলে যায়৷

কোনো বস্তু কি এতো পবিত্র হতে পারে যে তা’ বিক্রি করা চলে না? আইন-আদালতের কাছে এ’ প্রশ্নের কোনো উত্তর প্রত্যাশা করাটাই হয়তো ভুল৷ অ্যারিজোনার হপি উপজাতির ইন্ডিয়ানদের এই মুখোশগুলি কাঠ, চামড়া, ঘোড়ার লোম এবং পাখির পালক দিয়ে তৈরি৷ লাল-নীল-হলুদ-কমলা রঙে রাঙানো৷ হপি ইন্ডিয়ানদের কাছে এগুলি পিতৃপুরুষের আত্মার আধার৷ প্যারিসের দ্রুও নিলেম সংস্থায় এগুলো নগদ মূল্যে – এরকম ভালো রকম নগদ মূল্যে বিক্রি হবে৷ কিন্তু হপি ইন্ডিয়ানরা তাকে স্রেফ চুরি বলেই মনে করছে৷

নিলেম হবে প্যারিসে, কিন্তু ঝড় উঠেছে অতলান্তিকের অপর পারেও৷ হপি ইন্ডিয়ানরা তো বটেই, সেই সঙ্গে অপরাপর নেটিভ অ্যামেরিকান শিল্পী, মায় প্রখ্যাত হলিউড চিত্রাভিনেতা-চিত্রপরিচালক রবার্ট রেডফোর্ড মুখোশগুলি যা’তে বিক্রি করা না হয়, সেজন্য সোচ্চার হয়েছিলেন৷ হপি ইন্ডিয়ানদের আনা অভিযোগের ভিত্তিতে প্যারিসের আদালত শুক্রবার রায় দেয়৷ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফরাসি সরকার এবং নিলেম সংস্থাটিকে চিঠি পাঠিয়ে বিক্রি স্থগিত রাখার অনুরোধ করেন৷

‘আর্ট মার্ট’

আধুনিক শিল্পকলা আবার একটা বাজারও বটে, যাকে ইংরিজিতে বলে আর্ট মার্কেট৷ সেই মার্কেটে সব কিছুর দর নির্ধারিত হয় তার চাহিদা থেকে৷ হপি মুখোশগুলোর দাম নাকি ৫০,০০০ ইউরো হওয়াটাও অসম্ভব নয়৷ কাজেই এখানে পিতৃপুরুষের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শনের প্রশ্ন ওঠে কোথা থেকে? হপি উপজাতি এবং সার্ভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল সমিতি বৃহস্পতিবারের শুনানিতে যুক্তি দেয় যে, হপি মুখোশগুলি তাদের আধ্যাত্মিক মূল্যের কারণে ফরাসি আইন অনুযায়ী বিক্রয় করা চলে না৷

মুখোশ এবং অন্যান্য জিনিষ মিলিয়ে প্রায় ৭০টি বস্তু, প্রধানত হপি সংস্কৃতির নিদর্শন৷ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে কিংবা বিংশ শতাব্দীর সূচনায় সৃষ্ট৷ ত্রিশের কিংবা চল্লিশের দশকে অ্যারিজোনার কোনো ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশন থেকে নেওয়া৷ এক অজ্ঞাত ফরাসি অনুরাগীর সংগ্রহে ছিল এই সব মূল্যবান – কিংবা অমূল্য – বস্তু৷ ইউরোপে এগুলো দেখতে পাওয়াটাই বিরল, নিলেম তো দূরের কথা৷ ওদিকে হপিদের কাছে এ’সব বস্তুর ছবি তোলাটাও ঐশ্বরীয় বস্তুর অবমাননার সমতুল৷

পিতৃপুরুষের আত্মা

হপিরা বলে, মুখোশগুলো শিল্পকলা নয়৷ মুখোশগুলি হল তাদের পরলোকগত পিতৃপুরুষদের আত্মা৷ ‘‘এ’ শুধু শিল্পকলা কিংবা দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখার কিংবা বিয়ের দিনে পরার কোনো অলঙ্কার নয়৷ এগুলিতে মৃতদের আত্মা জীবিতদের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন হচ্ছে৷ ফরাসি আইন অনুযায়ী কোনো কবরও কেনা কিংবা বেচা সম্ভব নয়,” আদালতে যুক্তি দেখিয়েছেন হপিদের ফরাসি আইনজীবী পিয়ের সের্ভঁ-শ্রাইবার৷

মুখোশগুলি হপিদের ধর্মপালনের সঙ্গে যুক্ত৷ শুধুমাত্র একজন হপিই এগুলির মালিক হতে পারে৷ মুখোশগুলি নিশ্চয় বেআইনিভাবে অপরের হাতে গিয়েছিল…৷ হপিদের যাবতীয় যুক্তি সত্ত্বেও আদালত নিলেমের সপক্ষেই রায় দিয়েছেন এবং মুখোশগুলির নিলামও যথারীতি শুরু হয়েছে৷ আদালতের রায়ও এক হিসেবে দ্ব্যর্থক: হপিরা যে মুখোশগুলির ‘‘পবিত্র মূল্যে” বিশ্বাস করে, আদালত সে বিষয়ে অবহিত৷ অপরদিকে মুখোশগুলিকে মানুষের মরদেহ কিংবা দেহাংশের সঙ্গে তুলনা করা চলে না – ফ্রান্সে যা বিক্রয় করা নিষিদ্ধ৷ এছাড়া আদালতের মতে মুখোশগুলির ক্ষতি হবার আপাতত কোনো ঝুঁকি নেই৷

হপিরা নিরাশ, বিষণ্ণ৷ আদালতের রায় যদি অন্যরকম হতো, তাহলে ইউরোপ তথা বিশ্বের আর্ট মার্কেটে একটা ছোটখাট বিপ্লব ঘটে যেতো৷ এবং কে জানে, হয়তো শুধু শিল্পকলার বাজারেই নয়…

এসি / এসবি (এপি)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *



এই পাতার আরো খবর -

জার্নাল