March 24, 2017, 11:48 pm | ২৪শে মার্চ, ২০১৭ ইং,শুক্রবার, রাত ১১:৪৮

আপনিও বদরুল। সেই একই রাজনীতি করেন!

badrulশারমিন শামস্ ।। কিছু ছেলে এমন ভাব করতেছে, বদরুল ছাত্রলীগ দেখে এত খারাপ। আবার কিছু আবিস্কার করেছে, সে ছাত্রলীগ নয়, সে শিবির। অতএব শিবির বলেই এত খারাপ। হয়তো সামনে জানা যাবে, সে ছাত্রদল বা ছাত্র ইউনিয়ন করতো। এখন ছেলেটা কেন খারাপ, তার কারণ সে কী রাজনীতি করতো, সেইটা।

তো আমি যদি কই, এইসব কোনটাই না, ওই বদরুল এবং যাবতীয় পুরুষ যে রাজনীতি করে, তার নাম পুরুষতন্ত্র, ভুল কমু? এই রাজনীতির মূল শক্তি, পুরুষদণ্ড। একটি শিশ্নপ্রাপ্তির কারণে পুরুষ নিজেকে অধিক ক্ষমতাধর মনে করে এবং পুরুষতন্ত্র চর্চা করে। এখন গোটা সমাজই পুরুষদন্ড, থুক্কু পুরুষতন্ত্র চর্চা করে। এখন বদরুল, ছদরুল, কুদরুল সকলেই হয় পুরুষলীগ করে, অথবা পুরুষদল, পুরুষ শিবির কিংবা পুরুষ ইউনিয়নের সদস্য। বিষয়টা আরেকটু খোলাসা করি একটা উদাহরণ দিয়ে।

সাংবাদিক একটি মহৎ পেশা। আমি যেহেতু সাংবাদিকতা করেছি এবং করছি, সে কারণে সাংবাদিকদের কাছাকাছি থেকে তাদের বেশি চিনি। এখন এই মহৎ পুরুষ সাংবাদিকগণের মধ্যে কতজন নারীকে মানুষ ভাবে? কতজন আছে যারা মনে করে নারী ও পুরুষ কেউই কারো চেয়ে যোগ্যতায় কম নয়? আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, এই সংখ্যা শতকরা একভাগেরও কম। মিডিয়াতে শত শত মেয়েকে কাজ করতে দেখে ভুলেও ভাববেন না, পুরুষ নারীকে নিজেদের সমান যোগ্য ভাবছে, কাজে সাহায্য করছে এবং তাদের পথে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে না।

যদি মিডিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ ও কোন সাফল্য আসলেই থেকে থাকে, তার পুরো কৃতিত্ব নারীর। এখন, বদরুলে ফিরে আসি। মহৎ সাংবাদিক হলেই যে সে নারীর ব্যাপারে মহৎ ও সুস্থ, তা ভাবার যেমন কোন কারণ নাই, তেমনি বদরুল কোন রাজনীতি করতো তা দিয়ে সে নারীবান্ধব না নারীর শত্রু, এটি প্রমাণের কোন সুযোগ নাই। পুরুষ, বিশেষত এই নষ্ট সমাজের শতকরা নিরানব্বই জন পুরুষ নারীকে তাদের চেয়ে কম যোগ্য, কম শক্তিশালী একটি নিম্নস্তরের প্রাণী বলে মনে করে এবং নারীকে নিজের অধীনে রাখাটাকেই স্বাভাবিক কর্ম বলে ধরে নেয়।

তো এই সমাজে বদরুল কী রাজনীতি করলো, অর্থনীতি না ইংরেজি সাহিত্য পড়লো, স্বুল শিক্ষক নাকি মহৎপ্রাণ সমাজসেবক হইলো, তাই দিয়ে নারীর প্রতি তার চিন্তা, ভাবনা, কর্ম, আচরণ কোনকিছুই নির্ধারণ করা সম্ভব না। বদরুল বদরুলই। বদরুলের জন্ম হইসে ছদরুলের ঔরসে, তারপর তাকে পুরুষতন্ত্রের ধারক কুদরতী বেগম এবং ছদরুল সাহেব বড় করে তুলছেন। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কুদরুল, হাদরুলরা তাকে শিক্ষা দিছেন।

এবং এই সমস্ত শিক্ষা ও বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার কোনখানেই নারীকে মানুষ হিসেবে এবং পুরুষের সমান সম্মানের অধিকারী বলে দেখতে শিখানোর কোন শিক্ষা নাই। যে বিশাল সাংবাদিক টকশো’তে  আজ খাদিজাকে নিয়ে ঝড় তুলবেন, সেই লোক বাড়িতে গিয়ে বৌরে পিটায়, চাকরি করতে দেয় না, কর্মস্থলে নারী সহকর্মীর বুকের দিকে তাকায় কথা কয়, পরকীয়ার অফার দেয়, মেয়ের জন্য ম্যারিজ বীমা আর ছেলের জন্য শিক্ষা বীমা করে এবং দিনশেষে সে বিশাল নারীবান্ধব এইটা বুঝাইতে উইমেন চ্যাপ্টারের দুই একটা পোষ্টে ‘বাহ দারুণ লিখেছেন’- বলে কমেন্ট ছাড়ে। এখন সে কি বদরুল না?

বদরুল কোপাইছে। কোপাইছে কারণ সে মনে করে খাদিজার তারে ছেড়ে যাওয়ার কোন অধিকার নাই। ছয় বছর প্রেম করছে। অতএব খাদিজা তারে বিয়ে করবে, বাচ্চা বিয়াবে এবং বদরুল যা বলবে সেটাই করবে। খাদিজা কথা শুনে নাই। বদরুল বেশি বদমেজাজী। হিতাহিত জ্ঞান নাই। সে চাপাতি দিয়া কুপাইছে। এখন মাথা ঠাণ্ডা বদরুলরা খাদিজাকে এবিউসিভ কথা বলবে, গালিগালাজ করবে, হুমকি ধমকি দেবে। তাকে জুতা দিয়া, প্যান্টের বেল্ট দিয়া, লাঠি দিয়া পিটাবে। কেউ কেউ এমনভাবে পিটাবে যেন শরীরে দাগ না পড়ে, সেই বদরুলরা অত্যন্ত সাবধানী।

এখন বদরুল তো ঘরে ঘরে। আর আমরাও খাদিজা সক্কলেই। কেউ কোপ খায়, কেউ জুতা খায়, কেউ গালি খায়। ঘটনা ঘুরে ফিরে এক। তো ক্ষমতার আসনে পুরুষতন্ত্র। এরে টেনে ধইরা না নামানো পর্যন্ত খাদিজা লাথি জুতা চাপাতি খাবেই। এখানে বদরুলদের মিষ্টি কথা, সুমিষ্ট আচরণে বিভ্রান্ত হবার কোন কারণ নাই। বদরুলের ঘরের বৌ, মা, বোন জানে বদরুল আসলে কী করে। খেতে বসে সবার আগে মাছের বড় পিসটা টেনে নেয়, নাকি বোনের পাতে তুলে দেয়, সেটা বদরুলের বোনই জানে।

তো, রাজনীতি, দর্শন, শিক্ষা, ভালো ক্যারিয়ার, সমাজে ভালো মানুষের বেশ, উদার ব্যক্তিত্ব দেখে পুরুষকে আর যাই হোক অন্তত নারীবান্ধব ভাবার কোন কারণ নাই। পুরুষতন্ত্রকে হৃদয়ে ধারণ করা যেকোন ভদ্র সভ্য পুরুষ বা মহিলা শারীরিক বা মানসিক শক্তিতে, জ্ঞানে বুদ্ধিতে নারীরে পুরুষের চেয়ে কম ভাবেন।

তারাও আমার কাছে বদরুলই। তেনারা কোপান না, কিন্তু যারা কোপায় তাদের মাথায় মগজে যে চিন্তা চেতনা আর ক্লেদ জমে আছে, সেই একই ক্লেদ এইসব ভদ্র সভ্য শিক্ষিতদের অন্তরেরৱ প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে জমে জমে পলি হয়ে গেছে। পুরুষতন্ত্রের গদিটা ভেঙ্গে না পড়া পর্যন্ত বদরুল ছদরুল কুদরতীদের চাপাতি তাই চলবেই। কেউ থামাইতে পারবে না। সূত্র উইমেন চ্যাপ্টার।

ঢাকা জার্নাল, অক্টোবর ০৭, ২০১৬।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *



এই পাতার আরো খবর -

জার্নাল