March 30, 2017, 10:43 am | ৩০শে মার্চ, ২০১৭ ইং,বৃহস্পতিবার, সকাল ১০:৪৩

বদরুলনামা

badrulঢাকা জার্নাল : কলেজছাত্রী নার্গিসকে চাপাতির আঘাতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঠেলে দেওয়াই ছাত্রলীগ নেতা বদরুলের একমাত্র ‘কুকর্ম’ নয়। এর আগেও সে নার্গিসকে উত্ত্যক্ত করে গণধোলাইয়ের শিকার হয়েছে। বিভিন্ন প্রতারণার মাধ্যমে সুবিধা নিয়েছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের কাছ থেকে। আর ছোটবেলা থেকেই সে ছিলো উশৃঙ্খল স্বভাবের। তার সঙ্গে মিশেছেন, এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বদরুল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র। জড়িত ছাত্রলীগের রাজনীতিতেও। তার বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দক্ষিণ খুরিমা ইউনিয়নের মনিরগাতি গ্রামে। মঙ্গলবার ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বদরুলের মা, চাচা, ভাই, স্বজন কিংবা প্রতিবেশী- কেউ এ  ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না। তবে লজ্জা, ভয় আর ঘৃণায় কেউ এখন পর্যন্ত বদরুলকে দেখতে হাসাপাতাল বা আদালতেও যাননি।

গত ৩ অক্টোবর শাবি ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদরুল আলম সিলেটের এমসি কলেজের পুকুর পাড়ে নার্গিসকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। স্কয়ার হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকরা তাকে ৭২ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।

নিজ এলাকায় বদরুলের বদনাম নেই বললেই চলে। কিন্তু সিলেটে সে যেসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলো, তা গ্রামবাসী কিংবা স্বজনরা জানতেন না। ২০১২ সালে নার্গিস ছিল স্কুলছাত্রী। ওই বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের ঘোপাল এলাকায় নার্গিসকে উত্ত্যক্ত করতে গিয়ে এলাকাবাসীর গণধোলাইয়ের শিকার হয় বদরুল। পরে গণধোলাইয়ের ঘটনাকে জামায়াত-শিবিরের হামলা বলে প্রচারণা চালায় সে। কেবল তাই নয়, এ প্রচারণার ‘সফলতা’ হিসেবে সে ওই সময় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধাও নেয়। পরে সহ-সম্পাদক হিসেবে জায়গা করে নেয় শাবি ছাত্রলীগের কমিটিতে।

মনিরাগাতিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বদরুলের বেড়ে ওঠা দিনমজুর পরিবারে। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই উশৃঙ্খল স্বভাবের বদরুল স্থানীয় আলহাজ্ব আয়াজুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক। ওই স্কুলের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মখলেছুর রহমান বলেন, ‘মনিরাগাতি থেকে বদরুল স্কুলে আসা-যাওয়া করতো। ঘটনার দিন স্কুল বন্ধ ছিল। ঘটনাটি জানার পর স্কুল থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’

ইউপি সদস্য সুহেল আহমদসহ স্থানীয় লোকজন জানান, হাউশা গ্রামে নার্গিসদের বাড়িতে লজিং থেকে বদরুল শাবিতে লেখাপড়া করতো। তখন থেকেই সে নার্গিসকে উত্ত্যক্ত করতো। তার কুপ্রস্তাব নার্গিস প্রত্যাখ্যান করে এবং বাড়িতে জানিয়ে দেয়। তখন ওই বাড়ি থেকে বদরুলকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে গত সাত বছর ধরে সে নার্গিসের পেছনে লেগে ছিলো। এর মধ্যে কয়েকবার সে গণধোলাইয়ের শিকার হয়েছে। কিন্তু গায়ে ছাত্রলীগের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে এসব ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে সে।

বদরুলের ফেইসবুক বন্ধু হাসান সাঈদের এক স্ট্যাটাস থেকে জানা গেছে, বদরুল ছাতকের দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নের মুনিরজ্ঞাতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নতুনবাজার বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করে। টানা পোড়নের সংসারে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়ার পাশাপাশি এসএসসি ও এইচএসসিতেও ভালো ফল করে সে। এরপর ভর্তি হয় শাবিতে।

বদরুলকে নিয়ে পরিবারের সবার স্বপ্ন ছিলো, সে বড় হয়ে চাকরি করে সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু সে যে ধরনের ‘বড়’ হয়েছে, তা তারা ভাবতে পারেননি। বদরুলের মা দিলারা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি তো জানি আমার পুতে মাস্টারি করইন আয়াজুর রহমান ইস্কুলো। কিন্তু আমার পোয়া (ছেলে) অপরাধী। এ অপরাধী পোয়ার লগ ধরি আমি কী করমু। অতো কষ্ট  করি মায়ে-পুতে কাম করি বদরুলরে লেখাপড়া করাইলাম; আজ এ প্রতিদান পাইলাম।’

বদরুলের বড় চাচা আব্দুল হাই বলেন, ‘তার ছোট ভাইয়েরা কামলা দিয়ে বড় ভাইয়ের লেখা পড়ার খরচ যুগিয়েছে। তাদের শ্রমে ঘামে বদরুল শিক্ষিত হয়েছে। কিন্তু মানুষ হতে পারেনি; অমানুষ হয়েছে।’

ঢাকা জার্নাল, অক্টোবর ০৬, ২০১৬।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *



এই পাতার আরো খবর -

জার্নাল