July 25, 2017, 12:45 am | ২৪শে জুলাই, ২০১৭ ইং,মঙ্গলবার, রাত ১২:৪৫

সৈয়দ হকের সৃষ্টি পথ দেখাবে বাংলাদেশকে

shamsul-haqঢাকা জার্নাল : ইচ্ছের চেয়েও ৫ বছর পূর্বেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী দেখে যাওয়ার শেষ ইচ্ছে পোষণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু তার আগেই মঙ্গলবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সৈয়দ হক। তবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা বলছেন, সব্যসাচী এ লেখকের সৃষ্টিকর্মের মৃত্যু নেই। বরং তার সৃষ্টি পথ দেখাবে পুরো বাঙালি জাতিকে।

সাহিত্যের সব ক্ষেত্রে দাপুটে বিচরণের কারণেই শামসুল হক সব্যসাচী লেখক হয়ে ওঠেন। আর সেই বিষয়টি তুলে ধরেছেন দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের আরেক কিংবদন্তি ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।

তিনি বলেন, তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বরপুত্র। শিল্প-সাহিত্যের নানা শাখায় তার বিচরণ ছিল। নাটক, কবিতা, চলচ্চিত্র, সংগীত সব ক্ষেত্রেই তিনি আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন। তার কলমের স্পর্শে আমাদের সাহিত্যাঙ্গন সমৃদ্ধ হয়েছে, পূর্ণতা পেয়েছে বাঙালি মানস।

তবে কবির দৈহিক প্রয়াণ ঘটলেও তার সৃষ্টিকর্মই আশ্বস্ত করে সংস্কৃতিমন্ত্রীকে। নূর বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে তিনি দেশ ও জাতির কল্যাণে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। তার এ মহাপ্রয়াণ আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্য এক বড় দুঃসংবাদ। কিন্তু তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন সবসময়। তার সৃষ্টি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও দর্শন আলোকবর্তিকা হয়ে আমাদের, এ জাতিকে পথ দেখাবে।

সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যকর্ম বেঁচে থাকার যৌক্তিক ব্যাখ্যাও দিলেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম খান। তার ভাষায়, মানুষের প্রতি শামসুল হকের ভালবাসা ছিল অফুরন্ত। তিনি তার সাহিত্যের মাধ্যমে সেটি ফুটিয়ে তুলেছেন। মানুষের প্রতি তার ভালবাসা আর উদ্ভাবনী শক্তিই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে।

তবে সৈয়দ শামসুল হকের সৃষ্টি নিয়ে ব্যাপক কর্মতৎপরতার তাগিদ দিয়েছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী জাকের। তিনি বলেন, সৈয়দ হককে বুঝতে আরও সময় লাগবে। এখনও তাকে আমরা ঠিকভাবে বুঝতে পারিনি। তিনি এমন সব উপমা ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন লেখায়, যা আমরা এখনও বুঝিনা। সেজন্য তাকে নিয়ে আরও চর্চা করতে হবে।

সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রে বিচরণ করে রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে বহুমুখী সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন সৈয়দ শামসুল হক। এ সব্যসাচী লেখকে মুগ্ধ নাট্যব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, রবীন্দ্রনাথের মতোই তার সৃষ্টিকর্ম ছিল বিপুল। পশ্চিমের দিকে তাকালে তাকে নাটকের দিক দিয়ে সেক্সপিয়ারের কাছাকাছি মানের বললেও ভুল হবে না। রবীন্দ্রনাথ ১৫০ বছর ধরে বেঁচে আছেন, সেক্সপিয়ার ৪০০ বছর ধরে বেঁচে আছেন; সৈয়দ শামসুল হকও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বেঁচে থাকবেন।

একই আশাবাদ ব্যক্ত করে নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, রবীন্দ্রনাথের পর সাহিত্যের সব ক্ষেত্রে এতো সৃষ্টিশীলতা দেখিনি কারো মধ্যে। তিনি সৃষ্টির নেশায় উন্মুখ ছিলেন সবসময়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার হৃদয় জুড়ে ছিল বাংলাদেশ।

এদিকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা দিয়েই প্রয়াত লেখককে ধরে রাখতে চাইলেন কবি পিয়াস মজিদ। তিনি বলেন, তার মৃত্যুতে শোক করব না। রবীন্দ্রনাথের লেখা তার প্রিয় কবিতা দিয়েই তাকে শ্রদ্ধা জানাবো, ‘মৃত্যুর মুখে দাঁড়ায়ে জানিব তুমি আছো, আমি আছি।’ এই ‘আছি’ বোধের মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন।

কবির স্মৃতি বর্ণনা করে পিয়াস মজিদ আরও বলেন, এটা কাকতালীয় ব্যাপার, তার জন্মদিন ২৭ ডিসেম্বর, মৃত্যু ২৭ সেপ্টেম্বর। কারণ ২৭ সংখ্যাটিকে তিনি খুব উদযাপন করতেন। তিনি বলতেন, মির্জা গালিবের জন্ম ২৭ ডিসেম্বর, আমার জন্মও ২৭ ডিসেম্বর। আশ্চর্যভাবে তিনি চলেও গেলেন ২৭ সেপ্টেম্বর।

নিজের লেখালেখির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি একঝাঁক নতুন প্রতিভার সৃষ্টিও করেছেন তিনি। তার লেখা নাটক, চলচ্চিত্রে অভিনয় করে অনেকেই দর্শকদের নজর কেড়েছেন। তাই লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নাট্যভিনেতা তারিক আনাম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ম্যাকবেথ, ওথেলোসহ সেক্সপিয়ারের অনেক লেখা অবলম্বনে হক ভাই নাটক করেছেন। আমি সেসব চরিত্রে অভিনয় করেছি। এতো বিখ্যাত চরিত্রে অভিনয় করেছি। নাটকের নাম ইংরেজী, চরিত্র ইংরেজী; কিন্তু সেসব বিদেশি মনে হয়নি। কারণ তিনি এটি বাঙালির মতো করেই উপস্থাপন করেছেন।

তারিক আনাম বলেন, তিনি ছিলেন সত্যিকারের লেখক, চার হাতে লিখেছেন তিনি। তিনি চলে গেছেন কিন্তু এ লেখকের মৃত্যু নেই। তিনি বাংলা সাহিত্যকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন  যা একটি নতুন ধারা তৈরি করেছে। ইদানীং কালের বাংলা সাহিত্যে এমন কাউকে দেখি না।

কবির ব্যক্তি জীবনের কথা তুলে ধরে এ অভিনেতা বলেন, হাসপাতালে তার সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছে। তিনি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। কারণ তিনি জীবনকে ভালবেসেছিলেন, জীবন নিয়ে তৃপ্ত ছিলেন। চলাফেরা ছিল স্টাইলিশ, চশমা-পোশাক-ব্রেসলেটেই বুঝা যায় তিনি কতটা আধুনিক ছিলেন। তার মধ্যে কখনোই কোনো হতাশা দেখি নাই, তিনি নিজেই একটি অনুসরণীয় চরিত্র। তার মৃত্যুতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে এটি ঠিক, কিন্তু তার সৃষ্টি এতোই শক্তিশালী যে তিনি বেঁচে থাকবেনই।

সাহিত্যকর্মের বাইরেও চারুকলার প্রতি সৈয়দ হকের আগ্রহ ছিল বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডীন অধ্যাপক নিসার হোসেন। তিনি বলেন, চারুকলায় তার আগ্রহ ছিল, তিনি বাড়িতে তা চর্চাও করতেন। তাকে সম্প্রতি মোড়কের একটি ছবি এঁকে উপহার দিতে গিয়েছিলাম। তখনও জানতাম না তিনি অসুস্থ। চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে যাওয়ার পর বিষয়টি জেনেছি।

তিনি বলেন, বাংলা ভাষায় তিনি যে একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছেন, তাতে তাকে একজন শক্তিশালী সাহিত্যিক মনে হয়েছে আমার। গোটা বাংলা সাহিত্য তার কারণে অন্য জায়গায় উন্নীত হয়েছে।

সাহিত্যের পাশাপাশি লেখকের রাজনীতি সচেতনতাও অনেককে মুগ্ধ করেছে। চিত্রকর হাশেম খান সেদিকে ইঙ্গিত করে বলেন, তার উজ্জ্বল বৈশিষ্ট হলো অসাম্প্রদায়িকতা। আমরা এদেশে সে ধারা বজায় রাখতে চাই।

একই বিষয় তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে নানাভাবে

জড়িয়ে আছেন সৈয়দ শামসুল হক। তিনি এমন এক সময়ে চলে গেলেন, যখন আমরা জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী আন্দোলনে মাঠে আছি। তার চলে যাওয়ায় আমরা একজন বলিষ্ঠ প্রতিবাদী কণ্ঠ হারালাম।

সৈয়দ শামসুল হকের সেই দ্রোহের কথা বলতে গিয়ে নুরুলদীনকে টেনে আনলেন নাট্যকার নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। পরিবর্তন ডটকমকে তিনি বলেন, নুরুলদীন জাতীর প্রয়োজনে জাতির সামনে হাজির হয়েছিলেন। তিনি এখনও জাতিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস জোগান। আর নুরুলদীন কিন্তু আধুনিক মানুষ। কারণ তার উপস্থাপন কেবল ভাল না, খারাপ দিকও রয়েছে।

‘আমাদের রাজনীতি কেবল ভাল দিক বলে, মন্দটা স্বীকার করে না; হক ভাই সেসব থেকে মুক্ত ছিলেন। সে কারণেই নুরুলদীন এত আধুনিক’ বলেন বাচ্চু।

তিনি বলেন, বাংলা নতুন আঙ্গিক উপহার দিয়েছেন হক ভাই। নাটকে তিনি পশ্চিমা ধারা অনুকরণ না করে বাঙালির মতো করেই সাজিয়েছেন। তার চরিত্র আধুনিক, কিন্তু ভাষা ছিল গ্রাম্য। অন্যদিকে বুদ্ধদেব বসু ছিলেন পশ্চিমা শাসিত, পশ্চিমা অনুপ্রাণিত। এখানেই হক ভাই এগিয়ে, তাই পুরোপুরিই বাঙালির।

আর সে কারণেই তার সাহিত্যে দেশপ্রেম উপজীব্য হয়ে ওঠেছে জানিয়ে নাট্যকার মামুনুর রশীদ বলেন, তার সাহিত্যে যেভাবে দেশপ্রেম ফুটে ওঠেছে তা তার সময়ে আর কারও মধ্যে ছিল না। তার বিদায়ে বাংলা সাহিত্যের অনেক ক্ষতি হয়ে গেল।

ঢাকা জার্নাল, সেপ্টেম্বর ২৯০, ২০১৬।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *



এই পাতার আরো খবর -

জার্নাল